৩০ জুন তোমার জন্মদিন। ২০২৬ সালের আজকের এই দিনে বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তোমাকে স্মরণ করছি। শুভ জন্মদিন, বাংলার সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। তোমার জন্মদিনে দেশের সীমান্ত থেকে শুরু করে প্রতিটি নদী, প্রতিটি ধূলিকণা যেন আর্তনাদ করে বলছে—দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় তোমার সেই আপসহীন বজ্রকণ্ঠের আজ কতখানি প্রয়োজন ছিল। যখন আধিপত্যবাদী শক্তির নানামুখী চক্রান্ত ও দেশের মেরুদণ্ডহীন রাজনীতি আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে, সে সময় তোমার কথা মনে পড়ছে বারবার।
ভূরাজনৈতিক আঘাত ও সার্বভৌমত্বের সংকটের মহাকাব্য
চব্বিশের বিপ্লবের প্রাক্কালে ওসমান হাদি যখন দেশরক্ষার ডাক দিয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন যে, একটি দেশের স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রের রেখায় নয়, বরং তার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তায় নিহিত। দেশের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা থিংক-ট্যাংকগুলোর চলতি বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্তে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার অদৃশ্য ক্ষতি হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের (আইডব্লিউএমআই) পরিসংখ্যান বলছে, উজানের বাঁধের কারণে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর প্রবাহ বিগত দশকে প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে, যা পরিবেশগত সার্বভৌমত্বের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ডেটা সার্ভারে বিদেশি সাইবার আক্রমণের হার গত এক বছরে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ডিজিটাল ও পরিবেশগত এই আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় হাদির মতো দূরদর্শী সিপাহসালারের অভাব আজ প্রতিটি জাতীয় সংকটে অনুভূত হচ্ছে।
অনন্য বৈশিষ্ট্য ও বাস্তবমুখী ধারা
ভূরাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, শহীদ ওসমান হাদির চিন্তা ও দর্শন ছিল আধিপত্যবাদের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়ার এক ক্ষুরধার অস্ত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি বিজয়ী জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরতে হবে। তিনি সীমান্ত হত্যার আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি সেলের রূপরেখা দিয়েছিলেন।
সীমান্তসংলগ্ন গ্রামীণ জনপদের মানুষের শুধু পাহারাদার নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার ফ্রেমওয়ার্কও তিনি প্রণয়ন করেছিলেন, যাতে তাদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কেউ সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে না পারে। সীমান্ত সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রচলিত ও দুর্বল কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে সবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনের আলোকে বাংলাদেশের পানির অধিকার আদায়ে তিনি এক তাত্ত্বিক লড়াই শুরু করেছিলেন, যেখানে ভাটির দেশের পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞকে বৈশ্বিক জলবায়ু ফোরামে তুলে ধরাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মরে যাওয়া নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত করার জাতীয় মহাপরিকল্পনা তার ডায়েরির পাতায় আজও জাজ্বল্যমান।
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন ছিল হাদির দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। তিনি ভিনদেশি পণ্যের আগ্রাসন রুখে দিয়ে দেশি কুটির ও ভারীশিল্পকে চাঙা করার শক্তিশালী অর্থনৈতিক থিসিস উপস্থাপন করেছিলেন। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধে নিজস্ব লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির জোয়ার তৈরি করতে তিনি কাজ করে গেছেন, যা বিজাতীয় বিলাসিতার বদলে দেশীয় গর্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। মেধা পাচার রোধে তিনি গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধির জোরালো দাবি তুলেছিলেন। বঙ্গোপসাগর ও ব্লু-ইকোনমি রক্ষায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে তার গবেষণা আজ দেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য এক মূল্যবান পাথেয়। অনলাইনে দেশবিরোধী ও সার্বভৌমত্ববিরোধী প্রোপাগান্ডা রুখতে তিনি একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ডিফেন্স সেল গঠনের তাগিদ দিয়েছিলেন, যেখানে জাতীয় ডেটা সার্ভারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহারই ছিল একমাত্র শর্ত।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি সব ধর্ম ও মতের মানুষকে এক পতাকাতলে আনার ঐতিহাসিক ঐক্য গঠন করেছিলেন। তিতুমীর থেকে শুরু করে ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া বীরদের সংগ্রামকে তিনি নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তুলেছিলেন, যাতে তরুণদের মন থেকে হীনম্মন্যতা দূর হয়ে অপরাজেয় বিজয়ীর মানসিকতা গড়ে ওঠে। তিনি বলতেন, ‘যে জাতি তার বীরদের চেনে না, সেই জাতি কোনোদিন সীমান্ত রক্ষা করতে পারে না।’
এক স্তম্ভিত জনপদ
যে কণ্ঠস্বরটি দেশের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে গর্জে উঠত, সেই কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো বিজাতীয় ষড়যন্ত্রের বুলেটে। একদল হায়েনা যখন তার ওপর আঘাত হেনেছিল, তখন তারা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি, বরং আঘাত করেছিল বাংলাদেশের মানচিত্রের ওপর। কিন্তু আমরা কি তার ত্যাগের মর্যাদা দিচ্ছি? আজ যারা নতিস্বীকারের রাজনীতি করছেন, তারা কি একবারও শহীদ ওসমান হাদির রক্তের দাগ আর তার আপসহীন বজ্রকণ্ঠের কথা মনে রেখেছেন?
এক অনন্ত সার্বভৌম আর্তি
হাদির অনুপস্থিতি আজ আমাদের অস্তিত্বকে কম্পমান করে তুলছে। তার রাষ্ট্র সংস্কারের চিন্তার অপ্রকাশিত খসড়াগুলো আজ অবহেলার শিকার। আমরা আজ মেকি উৎসবে মত্ত হয়েছি, কিন্তু সীমান্তের মানুষগুলো আজ নিরাপদ নেই, যাদের জন্য হাদি দিনরাত এক করে পরিকল্পনা করেছিলেন। ব্ল-ইকোনমির সেই অমিত সম্ভাবনা আজ অন্ধকারে ডুবে আছে, কারণ হাদির মতো দূরদর্শী তাত্ত্বিক আজ বেঁচে নেই। তার জন্মদিনে বিবেক আমাদের প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? হাদির কণ্ঠ স্তব্ধকারীদের চক্রান্ত আজও পর্দার আড়ালে সক্রিয়, অথচ তার দর্শনকে আমরা অবহেলায় ঘরের এক কোণে ফেলে রেখেছি।
স্ট্যাটিক্যাল তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ
হাদির দেশপ্রেম এবং দেশের সামষ্টিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বুঝতে আমাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও সোর্সভিত্তিক তথ্যের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে—
বিআইপিএসএসের ডেটা : ২০২৬ সালের সামরিক কৌশলগত সমীক্ষা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বিগত পাঁচ বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছে।
যৌথ নদী কমিশনের খতিয়ান : ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে মাত্র ৩টিতে পানির চুক্তি থাকায় শুকনো মৌসুমে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৪৫ শতাংশ এলাকা মরূকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পরিসংখ্যান : সীমান্তে বেসামরিক লোকজন হত্যার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে সঠিকভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় সীমান্তবর্তী জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার হার প্রায় ৬০ শতাংশ।
বিএসপির সাইবার ইনডেক্স : দেশের আর্থিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদেশি উৎস থেকে আসায় জাতীয় তথ্যের গোপনীয়তা হুমকির মুখে।
বিইপিজেডের শিল্প প্রতিবেদন : দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ শতাংশ পিছিয়ে আছে।
বিবিএস শিক্ষা পরিসংখ্যান : মেধা পাচারের ফলে প্রতিবছর দেশ থেকে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার বুদ্ধিবৃত্তিক মূলধন হারিয়ে যাচ্ছে, যা হাদির গবেষণার অন্যতম বিষয় ছিল।
মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট : বঙ্গোপসাগরে ব্লু-ইকোনমি থেকে সম্ভাব্য আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ আমরা আহরণ করতে পারছি, যা ভূরাজনৈতিক অদক্ষতার পরিচয় দেয়।
ইবাদতের মননশীলতা
আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের বলছে জগৎ এখন ‘বৈশ্বিক গ্রাম’ ও সীমানাহীন বিশ্বের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রজ্ঞা বলছে—জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই নয়। ইবাদতের আঙিনা যেমন পবিত্র, দেশের সীমানা রক্ষা করাও তেমনি একটি আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। নিজের মুখোমুখি হওয়া মানে এই জাতীয় অবহেলার দায় স্বীকার করা। বিদেশি শক্তির কাছে মাথানত করার চেয়ে একটি পরিচ্ছন্ন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকাই স্রষ্টার কাছে শ্রেষ্ঠ ইবাদত।
এক দীপ্ত শপথের উপসংহার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের একটি কঠোর সত্য উপলব্ধি করতে হবে, বাইরের কোনো শক্তিই আমাদের ঘরকে নিরাপদ করবে না, যদি না আমরা নিজেদের ঘরের দরজার তালাটি মজবুত করি। সার্বভৌমত্ব হলো একটি জাতির আত্মমর্যাদার শেষ আশ্রয়স্থল। শহীদ ওসমান হাদি দেশের সার্বভৌমত্বের শুধু একজন পাহারাদার ছিলেন না, তিনি ছিলেন সেই অসমাপ্ত দেয়াল, যা আধিপত্যবাদের ঝড় থেকে আমাদের আগলে রাখতে চেয়েছিল।
শুধু ব্যক্তিগত লাভ আর রাজনীতির সমীকরণ দিয়ে হাদির মতো শহীদদের দেশপ্রেম মাপা যায় না। প্রজ্ঞা শুধু কূটনৈতিক প্রটোকলে নেই, প্রজ্ঞা আছে নিজের নদী ও মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য বজ্রকণ্ঠে কথা বলার মাঝে। মনে রাখতে হবে, দেয়াল সোনার হলেও তা ভেঙে পড়লে শত্রু ঘরে ঢুকবেই; আর সার্বভৌমত্বের দেয়াল শক্ত হয় আপসহীন দেশপ্রেমের ইটে। আসুন, আমরা শহীদ ওসমান হাদির জন্মদিনে শপথ নেই, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা কখনো আপস করব না। তার সেই অসমাপ্ত দেয়ালকে আমরা আরো মজবুত করব আমাদের দেশপ্রেম দিয়ে। একই সঙ্গে আল্লাহর দরবারে সবসময়ই দোয়া করব দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন দেওয়া শহীদ ওসমান হাদির জন্য ।
প্রথম লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ, যুক্তরাজ্য
দ্বিতীয় লেখক : রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রজেক্ট অ্যানালিস্ট
ইউএনডিপি বাংলাদেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




