বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রচেষ্টার পাশে দাঁড়িয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিতে যা যা করা সম্ভব, জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে সব তিনি করবেন।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রত্যাশা করে সংস্কারে সহায়তা দেওয়ার কথা জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হচ্ছে, সংস্কারের মূল কাজটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও সরকারকেই করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য।
বাংলাদেশে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করার আগের দিন শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গণতন্ত্রে উত্তরণ সম্পর্কে এই প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তার সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। জাতিসংঘ মহাসচিব রোববার ঢাকা ত্যাগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির জনগণ বৃহত্তর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। তাদের এ স্বপ্নের আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তাদের উচিত বাংলাদেশের ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা। তিনি জানান, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে শান্তি, জাতীয় সংলাপ, পারস্পরিক বিশ্বাস ও স্থিরতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে প্রস্তুত।
জাতিসংঘ মহাসচিব আরো উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সফরকালে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে এগোতে দেশটির জনগণের আশাবাদ তাকে চমৎকৃত করেছে। বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন সময় পার করছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কার ও পরিবর্তনের পথে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। জাতিসংঘকে বাংলাদেশ বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবেও পাশে পাবে।
শনিবার দুপুরে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে জাতিসংঘ ঢাকা কার্যালয়। এতে সরকারের প্রতিনিধি, সংস্কার কমিশনের প্রধানরা এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, নির্বাচন এবং সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে সংস্কার কমিশনের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনও তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের বক্তব্যে নির্বাচনের আগে কতটুকু সংস্কার হবেন, সে সম্পর্কে বক্তব্য আসে। জাতিসংঘ মহাসচিব সব বক্তব্য শোনার পর বলেন, বাংলাদেশের অংশীজনরাই সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। কতটুকু এবং কীভাবে করবে, সে বিষয়ে তাদেরই ঠিক করতে হবে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সংস্কারে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে শান্তিরক্ষা মিশন প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় অন্যতম দেশ। শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের অন্যতম বিপৎসংকুল জায়গায় কাজ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ অন্যতম অবদান রাখছে। এ জন্য তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের প্রতি তার সর্বাত্মক সহায়তা থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কূটনৈতিকরা মনে করেন, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফর সরকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দেশের কঠিন সময়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশে আসা, গণতান্ত্রিক উত্তরণে সহায়তার কথা বলা, সংস্কারের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বৃহত্তর উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস বাংলাদেশের মনোবলকে চাঙা করবে। একই সঙ্গে জুলাই বিপ্লবোত্তর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এ সফর সরকারের প্রতি দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও।
বাংলাদেশ সফরকালে জাতিসংঘ মহাসচিব কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও কাজ প্রত্যক্ষ করেছেন। রমজানের প্রতি সংহতি জানাতে রোজা রেখে ইফতারে অংশ নিয়েছেন লাখো মুসলিম রোহিঙ্গার সঙ্গে।
শুধু ইফতারই নয়, তিনি ইফতার অনুষ্ঠানে হালকা নকশার সুন্দর সাদা পাঞ্জাবি পরে বাংলাদেশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। শনিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনের আগে জাতিসংঘ মহাসচিব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছাড়াও জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী তরুণ ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেওয়া ইফতার এবং ডিনারেও অংশ নেন।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গ স্থান পায়। প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে কিংবা আগামী বছরের জুনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। তিনি মহাসচিবকে ব্যাখ্যা করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি ‘সংক্ষিপ্ত সংস্কার প্যাকেজ’ নিয়ে একমত হয়, তবে নির্বাচন ডিসেম্বরেই হতে পারে।
আর তারা যদি ‘বৃহৎ সংস্কার প্যাকেজ’ নিয়ে একমত হয়, তাহলে নির্বাচন আগামী বছরের জুন নাগাদ অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা আরো জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের বিষয়ে ইতোমধ্যে ১০টি রাজনৈতিক দল তাদের মতামত দিয়েছে। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অন্যরা এখনো মতামত দেয়নি।
বিএনপি বলেছে, তারা ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বলে মতামত দেবে না। মতামত দেবে সুনির্দিষ্টভাবে। সংস্কার প্রস্তাবের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছালে তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবেন। এই জুলাই সনদ হচ্ছে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পাশাপাশি রাজনৈতিক, বিচারিক, নির্বাচনসংক্রান্ত, প্রশাসনিক, দুর্নীতি দমন এবং পুলিশ সংস্কারের একটি রূপরেখা।
প্রসঙ্গ উল্লেখ্য, গত ১৫ বছর দেশ কবজা করে রেখেছিল শেখ হাসিনার মাফিয়া সরকার। তাদের দানবীয় শাসনে গণতন্ত্র নির্বাসনে চলে যায়। আইনের শাসন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে পড়ে। পঁচাত্তরের একদলীয় বাকশালী শাসনের চেয়েও ভয়ংকররূপে আবির্ভূত হয় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন। শেখ হাসিনার আচরণ এমনভাবে প্রকাশ পেতে থাকে, যা জার্মানির নাৎসি নেতা হিটলারের শাসনের কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন, ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে পিতা শেখ মুজিবকেও ছাড়িয়ে যান শেখ হাসিনা। তিনি তার অপশাসনের পনেরো বছরে এমন তিনটি নির্বাচনের আয়োজন করেন, যা কোনো নির্বাচন ছিল না। নির্বাচনের নামে ছিল ন্যক্কারজনক ভোট প্রহসন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিনাভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচন দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। এ তিনটি নির্বাচনে ভোটের অধিকার শুধু হরণ হয়নি, নির্বাচনের ওপর থেকে মানুষের আস্থাও চলে যায়।
অবশেষে ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দুই হাজার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে শেখ হাসিনার মাফিয়া সরকারের পতন হয়। মাফিয়া ডন হিসেবে চিহ্নিত শেখ হাসিনা প্রাণ বাঁচাতে ভারতে পালিয়ে যান। তার পতনের পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষ আবার গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তারা আশা করছেন, অচিরেই দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। বিপ্লবোত্তর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নির্বাচন দিতে বদ্ধপরিকর। তবে সরকার চায় দেশে এমন একটি নির্বাচন হোক, যে নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য। এ জন্য কতগুলো সংস্কার তারা বাস্তবায়ন করতে চান।
সেই লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশনগুলো ইতোমধ্যে তাদের সুপারিশ প্রতিবেদন আকারে জমা দিয়েছে। এসব সুপারিশের আলোকে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টির জন্য একটি ঐকমত্য কমিশনও গঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের দুদফা বৈঠকও হয়েছে। সামনে আরো বৈঠক হবে। নির্বাচনের রোডম্যাপ এখনো ঘোষণা হয়নি। প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারে কয়েকবারই বলেছেন, নির্বাচন হবে ডিসেম্বরে।
সর্বশেষ তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন আগামী ডিসেম্বর কিংবা পরের বছর জুনের মধ্যে হওয়ার কথা বলেছেন। আমার দেশ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, আমাদের প্রথম লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করা। কোনো কারণে যদি এক সপ্তাহ-দুই সপ্তাহ বা তিন সপ্তাহ সময় বেশি লাগে, হয়তো লাগতে পারে। যদি আরেকটু সময় লাগে চার-পাঁচ সপ্তাহ বড়জোর লাগতে পারে।
জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের উদ্যোগে ইতোমধ্যে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। এ দলের নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি। সংক্ষেপে এনসিপি। এ দলের আহ্বায়ক হচ্ছেন সাবেক তথ্য, সম্প্রচার ও টেলিকম উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। সদস্য সচিব আক্তার হোসেন। নির্বাচনের জন্য তারা কিছুটা সময় চাচ্ছেন। এ জন্য তারা সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, সংস্কার সম্পন্ন না করে নির্বাচন করা যাবে না। তাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীও কিছুটা সময় নিতে চাচ্ছে।
কিন্তু দেশের বৃহত্তম দল বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে, গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য নির্বাচন তাড়াতাড়ি হওয়া উচিত। বিএনপি চায় নির্বাচন ডিসেম্বরেই হোক। এ নিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য চলছে। সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে ন্যূনতম সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচনী রোডম্যাপ সরকারের ঘোষণা করা উচিত। এ প্রসঙ্গে বিএনপি আরো বলেছে, সংস্কারের জন্য বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। এই সংস্কার প্রস্তাবে অনেক কিছুই বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো করে ফেললেই হয়। এগুলো নিয়ে কালক্ষেপণের প্রয়োজন নেই।
কারণ কালক্ষেপণের ফলে দেশে ক্রমেই অরাজকতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নানা ইস্যু নিয়ে সুযোগসন্ধানী মহল বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে চলেছে। পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসররাও সক্রিয় হয়ে উঠছে। তারা বিক্ষোভে ইন্ধন জোগাচ্ছে। নির্বাচন হয়ে গেলে সুযোগসন্ধানীরা তাদের কুমতলব বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
বর্তমান রোজার মাস মাহে রমজান রাজনৈতিক দলগুলোকে পরস্পরের কাছাকাছি আসার একটা বড় সুযোগ করে দিয়েছে। প্রতিদিন রাজনৈতিক দলগুলোর ইফতার হচ্ছে। ইফতারে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা পরস্পরের সঙ্গে এক টেবিলে বসছেন। প্রতিদিনের এই দৃশ্য মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করেন, দলগুলো যেন আর বিরোধে না জড়ায়। নির্বাচন প্রশ্নে তারা যেন ঐকমত্যে পৌঁছে এবং দেশে সুন্দর একটি নির্বাচন হয়।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


