আমার দেশ-এর নবযাত্রার আজ দুই মাস পাঁচ দিন হলো। প্রায় সাড়ে ১১ বছর বন্ধ থাকার পর গত ২২ ডিসেম্বর আমার দেশ আবার প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় পাখির চোখে দেখা আমার নির্ধারিত কলামের নাম। কিন্তু স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আমার দেশ বন্ধ করে দেওয়ায় এ কলামও প্রকাশিত হয়নি। এ সময় দৈনিক নয়া দিগন্তসহ কয়েকটি পত্রিকায় বিচ্ছিন্নভাবে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পাখির চোখে দেখা প্রকাশিত হয়নি।
আজ পাখির চোখে দেখা শুরু হলো দুটি বিখ্যাত বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের হাজার বছরের রাজনীতির ইতিহাস নিয়ে চমৎকার দুটি বইয়ের লেখক আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। দুটি বই-ই ইংরেজিতে লেখা। একটির নাম ‘দ্য রাইজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অব ইন্ডিয়ান হেজিমন ইন সাউথ এশিয়া’ এবং ‘দ্য পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অব মুসলিম বেঙ্গল : অ্যান আনফিনিশড ব্যাটল অব ফেইথ’।
মালয়েশিয়ায় ও তুরস্কে নির্বাসনে থাকাকালে লেখক মাহমুদুর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার পিএইচডি থিসিসের ভিত্তিতেই প্রথম বইটি লেখা। আর মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস বইটি তিনি লিখেছেন জেলে বন্দি থাকাকালে। জেল থেকে বেরিয়ে মালয়েশিয়ায় নির্বাসনের সময় লন্ডন থেকে তার এই বইটি প্রকাশিত হয়।
অনন্যা প্রকাশনী থেকে এবারের বইমেলায় প্রকাশিত ইন্ডিয়ান হেজিমন বইতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস বর্ণনা করেছেন লেখক। তিনি গল্পের মতো করে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বইটিতে তুলে ধরেছেন তিন হাজার বছর আগে থেকে মানুষ কীভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলোয় স্থায়ী বসতি স্থাপন শুরু করেন। মধ্য এশিয়া থেকে, কারাকোরাম পর্বত অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ায় এসে স্থায়ী ঠিকানা গড়েছেন। গ্রিক, পারস্য, তুরস্ক ও আরবের মানুষ এসেছেন এখানে। বইতে আছে ব্রিটিশ উপনিবেশের সম্পূর্ণ কাহিনি। আছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এ অঞ্চলে রাজত্ব ও দখলদারির কথা। ব্রিটিশরা কীভাবে ভারত উপমহাদেশে এবং শ্রীলঙ্কায় কলোনি স্থাপন করেছেন, সবিস্তারে তিনি তা বর্ণনা করেছেন। নেপালের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যুদ্ধ, আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের কথাও আছে এতে। লেখক বর্ণনা করেছেন আফগান যুদ্ধে কীভাবে ব্রিটিশরা পরাজিত হয়েছে।
বইতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। কোন চুক্তিতে দেশভাগ হয়, চুক্তিটি কোথায় স্বাক্ষরিত হয়, ভারত ও পাকিস্তান কীভাবে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তার বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। কাশ্মীর সমস্যার কথা বইতে উল্লেখ করেছেন লেখক। কাশ্মীর হলো মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি অঞ্চল। কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ স্বাধীনতা লাভের সময় থেকেই। এই কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দুবার যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধগুলো হয় ১৯৪৭ এবং ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে। হিন্দু রাজার মাধ্যমে ভারত অন্যায়ভাবে কাশ্মীরকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কাহিনিও তুলে ধরা হয়েছে বইয়ে। একই সঙ্গে বাঙালির স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের কথাও আছে বইতে। আরো আছে ভারত ও পাকিস্তান কীভাবে পারমাণবিক বোমার অধিকারী হলো। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা এবং টানাপড়েন এখনো চলছে। কেন এই বৈরিতা, কেন এই টানাপড়েন-লেখক এর গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। তেমনি শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহ এবং এতে ভারতের ভূমিকা ও পরে রাজীব গান্ধীর হত্যার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের নানা কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক দেশটির অভ্যন্তরীণ সমস্যার কথাও বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিখ বিদ্রোহ, নকশাল বিদ্রোহ, কাশ্মীর সমস্যা, হিন্দু-মুসলিম বিরোধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজেপির উত্থান ও তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিশ্লেষণ। ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীদের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে লেখক ভারত, নেপাল এবং ভুটানের ওপর ভারতের আধিপত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। লেন্দুপ দর্জির মাধ্যমে ভারত কীভাবে সিকিমকে দখল করে, কীভাবে হায়দরাবাদ স্বাধীনতা হারায়, তার করুণ ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় তার সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপরই আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছে। কিন্তু ভুটান এবং শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশের ১৫ বছরের সময়কাল ছাড়া অন্যদের ওপর তেমন আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাবের জন্যই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনগণ প্রচণ্ড ভারতবিরোধী হয়ে ওঠে। ভারতের অভিলাষ সফল হতে দেয়নি। মানুষের প্রতিবাদ এবং লড়াকু মনোভাবের কারণে ভারতের আধিপত্যবাদী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষ ভারতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের গত জুলাই বিপ্লবের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। শেখ হাসিনার ভারততোষণ নীতি এবং বাংলাদেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার কারণে ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবে তার পতন হয়েছে। শুধু পতনই নয়, তাকে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়েছে। লেখক বলেছেন, ভারত যদি তার বর্তমান আধিপত্যবাদী নীতি অব্যাহত রাখে, তবে বিশ্ব দরবারে তার সম্মানজনক অবস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হবে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারত একটি বৃহৎ রাষ্ট্র। জনসংখ্যা দেড় শ কোটির কাছাকাছি। ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে চায়। সেই সম্মান অর্জন করতে হলে ভারতকে তার পররাষ্ট্রনীতি বদলাতে হবে। প্রতিবেশীদের প্রতি সহনশীল হতে হবে। সম্প্রসারণবাদ, আধিপত্যবাদ এবং মোড়লগিরি ত্যাগ করতে হবে।
‘মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস’
ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ স্কলার পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত বইটির নাম ‘দ্য পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অব মুসলিম বেঙ্গল : অ্যান অনফিনিশড ব্যাটল অব ফেইথ’। বাংলায় এর অর্থ : মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস : ধর্মবিশ্বাসের একটি অসমাপ্ত লড়াই।
বইটিতে ‘বাংলা’ নামের উৎপত্তির বর্ণনা থেকে এই ভূখণ্ডের এক হাজার বছরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ৪১২ পৃষ্ঠার এই বইয়ে ১২টি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘পূর্ব বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব : গত সহস্রাব্দের ইতিহাস’। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব এবং মুসলিমদের অধীনস্থতা। তৃতীয় অধ্যায়ে পাকিস্তানের জন্ম এবং বাংলা বিভাগ। চতুর্থ অধ্যায়ে মুসলিম পরিচিতির ওপরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিজয়, পঞ্চম অধ্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, ষষ্ঠ অধ্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশে মুজিবের শাসন ও স্বৈরতন্ত্র। সপ্তম অধ্যায়ে রয়েছে মুসলিম পরিচয়ের পুনর্জাগরণ : বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের উত্থান, অষ্টম অধ্যায়ে রাষ্ট্রধর্মের রাজনীতি : এরশাদ শাসনের হারানো দশক। নবম অধ্যায়ে সংসদীয় রাজনীতিতে ইসলামি সমীকরণ। দশম অধ্যায়ে ওয়ান-ইলেভেনের ‘ট্রোজান হর্স’। দশম অধ্যায়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন, দ্বাদশ অধ্যায়ে রয়েছে একটি ধর্মবিশ্বাসের অসমাপ্ত লড়াই।
বইটির পরিশিষ্টে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল স্থান পেয়েছে। যেমন : ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা, ১৯৬৬ সালের আওয়ামী লীগের ছয় দফা, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল, ১৯৭১ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ভাষণ, ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ‘মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি’ এবং উপমহাদেশে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি।
বাংলাদেশের বিশেষ করে মুসলিম বাংলার ইতিহাসভিত্তিক গবেষণাধর্মী এ বই কেন লিখলেন মাহমুদুর রহমান? তিনি নিজেই এর কারণ উল্লেখ করেছেন। বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলো, ৯০ ভাগ বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ ও বাংলা ভাষার উন্নয়নে মুসলিম শাসকদের মহান অবদান স্বীকৃতি পায়নি। সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি কেন এই উদাসীনতা? এটা কি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফল, নাকি অজ্ঞতা? নিজ শিকড় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ অন্ধ কোনো জাতি কি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে স্বাধীন থাকতে পারে? আমার এ বই লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য এসব প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান।’ লন্ডনে বইটি পাঠকমহলে সাড়া জাগায়। ইতোমধ্যে বইটির হার্ড বাঁধাই সংস্করণ শেষ হয়ে গেছে। প্রকাশক পেপারব্যাকে বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। আমাজন ডটকমে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও মজাদার তথ্য বইটিতে স্থান পেয়েছে। মাহমুদুর রহমান ‘বাংলা’ নামের উৎপত্তি নিয়ে তার বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মুসলিম সুলতানি ও মোগল আমলে ‘বাঙালাহ’ শব্দ থেকে বাংলা শব্দটি এসেছে। প্রাচীনকালে গঙ্গার তীরবর্তী, ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি জেলাকে বলা হতো ‘বঙ্গ’। ঐতিহাসিকরা সাধারণভাবে একমত যে, ফারসি শব্দ ‘বাঙালাহ’, পর্তুগিজ শব্দ ‘বেঙালাহ’ অথবা ‘পেঙালা’ থেকে ইংরেজি ‘বেঙ্গল’ শব্দটির উৎপত্তি। সেই সময়কার বাংলা থেকে আজকের বাংলাদেশ অনেক বড়।
এ দেশের ইসলামের গোড়াপত্তনের ইতিহাস তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান লিখেছেন, তুর্কি জেনারেল ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ১২০৩ সালে রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেছিলেন। তবে সমগ্র বাংলাকে একই মুসলিম শাসনের অধীনে আনতে প্রায় দেড় শ বছর লেগে যায়। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সমগ্র বাংলাকে অভিন্ন শাসনে নিয়ে আসেন। বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসন টিকেছিল দুই শ বছর। এরপর ষোড়শ শতাব্দীতে কিছুদিন শাসন করেন আফগান জেনারেল শের শাহ সুরী। পরে সম্রাট আকবর শেষ স্বাধীন আফগান শাসককে হটিয়ে এ অঞ্চলকে ‘সুবেহ বাংলায়’ পরিণত করেন। আকবরের ছেলে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ১৬১১ সালে মোগল জেনারেল ইসলাম খান চিশতী ‘ঢাকা’কে বাংলার রাজধানী করেন।
বাংলায় ইসলামের আগমন সম্পর্কে বইতে বলা হয়, ১২০৩ সালে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তনের আগে বাংলার অন্যান্য অংশ বরেন্দ্র (বর্তমান রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গ), পুন্ড্রু (বগুড়া), সমতট (কুমিল্লা), চন্দ্রদ্বীপ (বরিশাল), হরিকেল (সিলেট) ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। বঙ্গসহ এসব অঞ্চল এখন বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার অন্তর্ভুক্ত। সে সময় রাঢ়া, গৌড়, লখনৌতি, সাতগাঁ, তাম্রলিপ্তি ও হুগলি নামে যে এলাকা ছিল, তা এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অংশ।
ইসলামের আগমন সম্পর্কে বইতে বলা হয়, সম্ভবত অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে আরব বণিক এবং সামুদ্রিক পরিব্রাজকদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটে ও প্রাচীন নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও আরাকানে ইসলামের প্রচার শুরু হয়। কিছু কিছু শিক্ষাবিদ বিশ্বাস করেন, ইসলামের আবির্ভাবের পরপরই চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলে আরব মুসলিমরা বসতি স্থাপন করেছিলেন। পাহাড়পুর (বগুড়া) ও ময়নামতীতে (কুমিল্লা) প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আরবীয় এবং বিখ্যাত খলিফা হারুন-উর-রশীদের আমলের (৭৮৬-৮০৯ খ্রিষ্টাব্দ) মুদ্রাও পাওয়া গেছে।
এতে আরো উল্লেখ করা হয়, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে এ অঞ্চলে রাজনৈতিক ইসলামের আগমন ঘটেছিল। এর ফলে পারস্য, মধ্য এশিয়া ও আরব দেশগুলো থেকে সুফি সাধকসহ অনেক মুসলিম অভিবাসীর আগমনের পথ সুগম হয়। পূর্ব বাংলায় ইসলামের এই মহাকাব্যিক উত্থানে বিস্মিত হয়েছেন বিশ্বের ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা। মুসলিমদের বিজয়ের আগে শাসক ব্রাহ্মণ-শ্রেণি বাংলা ভাষাকে নিদারুণ তাচ্ছিল্য করত এবং একে চাষাভুষা ও জেলেদের ভাষা বলে বিবেচনা করা হতো। আর্য বৈদিক ভাষা হিসেবে তারা শুধু সংস্কৃতি ভাষাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন।
বৌদ্ধ ধর্ম এ অঞ্চলের অত্যন্ত প্রাচীন ধর্ম বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়। মাহমুদুর রহমান লিখেছেন, গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলায় এ ধর্ম ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। পরে একসময় বৃহত্তর ভারতে ব্রাহ্মণদের ধর্মের কাছে বৌদ্ধ ধর্ম হার মানে। এটা একটা প্রহেলিকা, যে বিশ্বধর্ম এ অঞ্চলে প্রায় দুই হাজার বছর আধিপত্য বজায় রেখেছিল, তা একসময় কার্যত হারিয়ে গেল। কিছু বৌদ্ধ সাহিত্যে বলা হয়, গৌতম বুদ্ধ খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে তৎকালীন পুন্ড্রে (বর্তমানে বগুড়া) এসে ছয় মাস অবস্থান করেছিলেন। এই বিশ্বাস যদি সত্য হয়, তবে এটা মেনে নিতে হবে, যিশু খ্রিষ্টের জন্মের বহু আগেই পূর্ব বাংলার মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অন্যদিকে ঐতিহাসিক দলিল বলছে, এ অঞ্চলে আর্য ও ব্রাহ্মণ ধর্ম এসেছিল খ্রিষ্টীয় তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীতে। বখতিয়ার খিলজির এ দেশে আগমনের আগে বৌদ্ধ ধর্ম একদিকে যেমন ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ সেনা শাসকদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল, তেমনি তার দার্শনিক ও নৈতিক ক্ষয়ও শুরু হয়েছিল। স্পষ্টই বোঝা যায়, বাংলায় দুটি ধর্মের মধ্যে দীর্ঘ ঐতিহাসিক লড়াই চলে। শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মকে নৈতিক ও চূড়ান্ত আঘাত হেনে সফল হয় ব্রাহ্মণ্যবাদ।
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের রোষানলে পড়ে সম্পাদক মাহমুদুর রহমান দুই দফায় প্রায় পাঁচ বছর জেলে বন্দি ছিলেন। প্রথম দফায় জেল থেকে বের হয়ে তিনি লিখেছিলেন-কোনো রক্তচক্ষুই আমার কলমকে থামাতে পারবে না’। না, লেখা থেকে তিনি নিবৃত্ত হননি। আমার দেশ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লিখেছেন। মাহমুদুর রহমানের ১৪টি বই বের হয়েছে এবং পাঠকমহলে সাড়া জাগিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে-জেল থেকে জেলে’, ‘নবরূপে বাকশাল’, ‘১/১১ থেকে ডিজিটাল’, ‘কার মান কখন যায়’, ‘জাতির পিতা ও নার্সিসাস সিনড্রোম’ এবং ফুলবাড়ীর রাজনীতি। আগেই উল্লেখ করেছি, ‘মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস’ বইটি তিনি লিখেছেন কাশিমপুর কারাগারে বন্দি থাকাকালে।
দ্বিতীয় দফায় মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর তিনি তখন কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘কারাবন্দি থাকাকালে ২০১৫ সালের শেষের দিকে তার মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বুঝি কারাগারেই কাটাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত মূলস্তম্ভ হিসেবে স্থান পাওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যের জন্ম হয়।
‘বৈরী পরিবেশে কারাগারে থেকে কীভাবে বইটি লিখেছেন, সেই সম্পর্কে মাহমুদুর রহমান লেখেন, ‘কাশিমপুর কারাগারে একটি ছোট লাইব্রেরি থাকলেও সেখান থেকে বিশেষ কোনো লক্ষ্য নিয়ে, অধ্যয়নের উপযোগী বই পাওয়া সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশে কারাবন্দিরা অ্যাকাডেমিক উদ্দেশ্যেও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পান না। নেই টাইপ রাইটার। সনাতনী আমলের মতো হাতেই লিখতে হয়। এ অবস্থায় তার বিদুষী স্ত্রী ফিরোজা মাহমুদ এগিয়ে আসেন। তিনি তাকে প্রয়োজনীয় বই এবং রেফারেন্সসামগ্রী সরবরাহ করতে শুরু করেন। তবে সেটিও সহজসাধ্য ছিল না। এক সপ্তাহ পরপর তিনি দেখা করার সুযোগ পেতেন। এর মধ্যে তার নতুন নতুন বইয়ের প্রয়োজন হলেও সেগুলো পেতে দীর্ঘ প্রতীক্ষা করতে হতো। তবে তার স্ত্রীর ধৈর্যে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে বইটি লেখার কাজ তাকে সহজ করে দেয়।’
লন্ডন থেকে প্রকাশিত বইতে মাহমুদুর রহমান লিখেছেন, ‘আমার ৬৩ বছরের জীবন কেটেছে অনেক উত্থান-পতনের মধ্যে, সম্ভবত তা ছিল সমানুপাতে। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার এবং নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনে তাদের পৃষ্ঠপোষকরা আমাকে একজন অনাকাঙ্ক্ষিত ইসলামপন্থি হিসেবে বিবেচনা করে। মজার ব্যাপার হলো, আমি কোনো ধর্মবেত্তা কিংবা ইসলামি দলের সদস্য নই। বস্তুত আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলাম না। আমি শুধু একজন আধুনিক মুসলিম, যিনি ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মনিষ্ঠ। আমি দাড়ি রাখিনি এবং পশ্চিমা পোশাক পছন্দ করি। তবে আমি অবশ্যই আমার ইসলামি ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত এবং সংবিধানে বর্ণিত দেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
‘আমার দেশ’ পত্রিকায় সাড়া জাগানো স্কাইপ কেলেঙ্কারি প্রকাশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বইতে লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনার জমানায় সত্যিই বাংলাদেশ চরম মেরূকরণকৃত এবং আহত একটি জাতি। দেশটি যেন ছিল করদরাজ্য। ইকোনমিস্ট পত্রিকা ও আমার দেশ-এ বিচারপতির (নিজামুল হক নাসিমের) অন্যায় বিচারের খবর প্রকাশের কারণে তার চাকরি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পদোন্নতি দেওয়া হয়। যেমনটা ভাবা হয়েছিল, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন (সাঈদী)-কে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। এতে সারা দেশে সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই সরকার নজিরবিহীন শক্তি ও সহিংসতার মাধ্যমে তার জবাব দেয়।’
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে ড. মাহমুদুর রহমানের বই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রদের জন্য খুব প্রয়োজনীয় বলে আমার মনে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের বইগুলো সংগ্রহের ব্যাপারে বলতে পারলে তারা খুব উপকৃত হবেন। লেখক জানিয়েছেন, দুটি বই তিনি বাংলায় অনুবাদ করবেন। ইতোমধ্যে মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস বইয়ের অনুবাদ তিনি শুরু করেছেন। এটি ধারাবাহিকভাবে আমার দেশ-এ প্রকাশিত হবে আশা করি।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


