বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের ছয় দফা আট দফায় পরিণত হয়েছে। জনগণের প্রয়োজনে দফা বাড়তে পারে, আবার জনগণের প্রয়োজনে সব দফা বিলুপ্ত করে এক দফা ঘোষণা করার প্রয়োজন হতে পারে। আপনারা প্রস্তুত আছেন?’ এর জবাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেছেন, এক দফার হুমকি দিলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না বিএনপি!
দেশে এখন তিনটি পক্ষ রয়েছে। একটি সরকারি পক্ষ, একটি বিরোধী পক্ষ এবং আরেকটি দেশ ও জাতির শত্রুপক্ষ! বিরোধী পক্ষটি যখন তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ে লংমার্চ করে বেড়াচ্ছে, তখন শত্রুপক্ষটি বাসে-ট্রেনে আগুন দিয়ে সারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে চলছে।
এনসিপির প্রিয় ছোট ভাইদের মুখে প্রধানমন্ত্রী কিংবা অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে কঠিন সমালোচনা শুনে যেমন অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, তেমনি গরিবের ইনু নামে খ্যাত রাশেদ খানের পাল্টা মিসাইলগুলো পিলে চমকে দেয়। তিনি সর্বশেষ তীরটি ছুড়ে মেরেছেন, ক্ষমতার মোহে জামায়াত-এনসিপি আওয়ামী লীগের আগুনসন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে! কাজেই খেলাটি মারাত্মক দিকে মোড় নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে! খাবে আব্দুল, মোটা হবে নজিবুল্লাহ!
আমি এখানে লংমার্চের যৌক্তিকতা বা এর পক্ষে-বিপক্ষে বলতে চাচ্ছি না। এই পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হলোÑসংশ্লিষ্ট সবাইকে সেই প্রশ্নটি করতে চাচ্ছি! কারণ অনেককে দেখে অনুমিত হচ্ছেÑসম্ভাব্য ঝুঁকি বা বিপদটি ইনারা আঁচ করতে পারছেন না!
শোনা যাচ্ছে, সারা দেশ থেকে লীগের কর্মী বাহিনী অটোরিকশার চালক হয়ে ঢাকায় জড়ো হচ্ছে। এতে আর্থিক এবং লজিস্টিক সব সহযোগিতা করছে পুলিশের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পুলিশ লীগের সদস্যরা। বিপুল অঙ্কের টাকা ঘুস দিয়ে এবং অমুক নেতার চাচাশ্বশুর কিংবা তমুক নেতার ভাগনি জামাই সেজে এসব পুলিশ লীগের সদস্য নিজেদের পজিশনিং করে ফেলেছে! বিষয়টি জোর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
দেশের পরিস্থিতি ভালোভাবে বুঝতে হলে নিচের গল্পটি সহায়ক হতে পারে।
প্রথম বিয়ের পর সব বিয়েকে আমাদের ময়মনসিংহ অঞ্চলে হাঙ্গামার বিয়ে বা সংক্ষেপে ‘হাঙ্গা’ বলা হয়। এ রকম হাঙ্গা বিয়ের এক দম্পতি। উভয়ের আগের ঘরের সন্তান রয়েছে। পরে তাদের নিজেদেরও কয়েকটি জন্ম হয়েছে। ফলে বাসাটিতে বহুমুখী ঝগড়া লেগেই থাকে। একদিন তুমুল ফাইট শুরু হয়ে গেলে ভদ্রমহিলা হন্তদন্ত হয়ে তার স্বামীকে জানায়, ওগো শুনছো! তাড়াতাড়ি আসো। কারণ তোমার গুলি আর আমার গুলি একজোট হয়ে আমাদের গুলিকে আক্রমণ শুরু করেছে!
দেশবাসীর অবস্থা এই মহিলার চেয়েও করুণ হয়ে পড়েছে! এ রকম একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, সেটি অনেক আগেভাগেই জানিয়েছিলাম! সেই আশঙ্কা থেকে সব পক্ষকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকারের পরামর্শ রেখেছিলাম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে উইনস্টন চার্চিলের নেতৃত্বে কনজার্ভেটিভ, লেবার ও লিবারেল প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গড়ে উঠেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলা করা। ১৯৪০-৪৫ সালের সেই জাতীয় ঐক্যের সরকার যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল।
শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জটি আরো কঠিন! ৫ আগস্ট এ দেশের জনগণ শুধু ফ্যাসিবাদী সরকারকে পরাজিত করেনি। একটি আধিপত্যবাদী শক্তি, যারা আমাদের দেশটিকে একটি করদরাজ্যে পরিণত করেছিল, তাদেরও শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। এই পরাজয় তারা হজম করতে পারছে না! পূর্ববঙ্গে নিজেদের জমিদারি হারিয়ে কায়েমি স্বার্থবাদী এই গোষ্ঠীটি যতটুকু না হতাশ হয়েছিল, এবার হয়েছে তার চেয়েও বেশি! যেকোনোভাবে এরা তাদের পুরোনো আধিপত্য ও কর্তৃত্ব ফিরে পেতে চায়। এই শক্তি তাদের সুবিধার জন্য এ দেশের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতি ধ্বংস করে ফেলেছিল! এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে টেনে তোলা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়!
কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পরপরই জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলো কোলিশন কোর্সে এগোতে থাকে। এতে সচেতন দেশবাসী প্রমাদ গুনে। পারস্পরিক সম্পর্কের এই তিক্ততা সৃষ্টিতে এ ক্ষেত্রে বিএনপি এবং জামায়াত কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে ছিল না।
জামায়াতের আমির তখন বলে ফেলেন, এক স্বৈরাচারকে সরিয়ে আরেক স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় বসাতে চাই না। তার এই মারেফতি কথা (যে কথার অনেক ব্যাখ্যা হয়) অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে।
এর বিপরীতে বিএনপি চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে উচ্চারিত ‘গুপ্ত -গুপ্ত’ শব্দ দুটি সুপার-ডুপার হিট হয়ে যায়। আমরা যারা এই দুটি দলের মধ্যে একটি মিনিমাম সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ওকালতি করেছি, তাদের কপালেও এই গুপ্ত শব্দটি এঁটে দেওয়া হয়।
গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে নির্মম আক্রমণ স্বাভাবিক ব্যাপার। নির্বাচন-পূর্ব এ রকম বাকবিতণ্ডা, তর্ক-বিতর্ক, কাদা ছোড়াছুড়ি মেচিওর্ড গণতন্ত্রের দেশগুলোয়ও হয়ে থাকে। তবে আমাদের সীমাবদ্ধতাটুকু হলো—নির্বাচনকালীন স্নায়ুচাপ বা ঠান্ডা যুদ্ধকে নির্বাচনের পরেও স্বাভাবিক করতে পারি না!
বিএনপির একটা অংশ আবার আওয়ামী লীগকেই বিরোধী দল হিসেবে শুধু মনে মনে কামনা নয়—প্রকাশ্যেও সেই মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। দলটি তাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার অনেক প্রফেটিক বাণী ভুলে গেছে। ম্যাডাম বলেছিলেন, সাপকে বিশ্বাস করা যায় কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায় না।
আওয়ামী লীগের সফট পাওয়ার এখন বিএনপিকে ভবিষ্যতে একসঙ্গে সুখে শান্তিতে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছেÑতা অচিরেই দুঃস্বপ্নে রূপান্তরিত হবে। একই ‘ওয়াসওয়াসা’ ভিন্ন অবয়বে জামায়াতের ওপরেও কাজ করছে বলে জানা গেছে।
আমরা এখন যা দেখছিÑএগুলো হলো সিকোয়েন্সিয়াল কনসিকোয়েন্স! সময়ের কাজটি সময়ে করার দরকার ছিল। পরিকল্পনা বা প্ল্যান সঠিক না হলে অ্যাকশন বা পদক্ষেপ ভুল হয়। অ্যাকশন বা পদক্ষেপ ভুল হলে পরিণামও ভালো হয় না।
এ কারণে শুরু থেকেই আমাদের জাতীয় নেতাদের পাবলিকলি এবং প্রাইভেটলি সতর্ক করতে চেষ্টা করেছি। জাতীয় নেতৃত্বের কাছে যতটুকু অ্যাকসেস ছিল, সেটুকু কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছি।
তজ্জন্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথমে জামায়াতের আমির মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করে ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি এবং তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দিই। জামায়াতের আমির মহোদয় বিষয়টি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং এ কথাও বলেন, বিএনপি আপনার এই প্রস্তাবে রাজি হলে আমাদের মন্ত্রিত্ব নেওয়ারও প্রয়োজন নেই! আমরা বাইরে থেকে সমর্থন দেব।
তারপর এ প্রস্তাবটি নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাবের সঙ্গে স্কাইপিতে কথা বলি ।
কিন্তু বিএনপি নেতৃত্ব প্রথমেই সন্দেহে পড়ে যান যে জামায়াতই আমাকে এই প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়েছে! অথচ ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে আমার জীবনের প্রথম দূতিয়ালিটা এভাবেই ব্যর্থ হয়ে গেল!
এ কাজটি করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় উপলব্ধি করলাম যে দেশের সব রাজনৈতিক পক্ষ তো দূরের কথা, জাতীয়তাবাদী আদর্শের দুটি দল দীর্ঘ সময় একসঙ্গে রাজনীতি করলেও উভয় দলের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো জাতীয় ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠেনি! কিংবা তা গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি!
মুশকিল হলো স্কেল দিয়ে মেপে সর্বদা মাঝ বরাবর কথা বলে একজন মতলববাজ সুশীল হওয়া যায়, কখনোই সত্যিকারের বিবেকবান মানুষ হওয়া যায় না । এ কারণেই এ দেশে সত্যিকারের বিবেক সৃষ্টি হলেও আমরা তাদের চিনে নিতে পারিনি, কিংবা জাতির প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারিনি!
ফলে গত ৫৫ বছরে যতগুলো রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার একটাও আমরা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে পারিনি। রাজনৈতিক সমস্যা অরাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছি! এর মূল কারণ এ দেশে সত্যিকার অর্থে কোনো সিভিল সোসাইটি গড়ে ওঠেনি কিংবা তা গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। সেজন্যই আমি ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছিলাম এনসিপি একটি শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি বা প্রেশার গ্রুপ হিসেবে আবির্ভূত হোক! এই উদ্দেশ্যে কিছু কাজও করেছিলাম!
তখন জুলাই বিপ্লবের কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম, তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ বা একধরনের হতাশা কাজ করেছে। তখন একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম সবাইকে একটা প্ল্যাটফর্মে এক করার নিমিত্তে!
মূল আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন এনসিপির ড. আতিক মোজাহিদসহ আরো কয়েকজন। ‘জুলাই অভ্যুত্থানের এক দফা বাস্তবায়নের পথ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভাটি হয়েছিল হোটেল সোনারগাঁওয়ের পদ্মা নামক হলটিতে, ১৫ অক্টোবর ২০২৪ সালে।
অতিথিদের মধ্যে আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান, কবি ফরহাদ মাজহার এবং আমি ছিলাম। তিন ছাত্র উপদেষ্টা, সারজিস, হাসনাত, আখতার হোসেন, আতিক মোজাহিদ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সামান্থা শারমিন, হান্নান মাসউদ, তাসনিম জারাসহ টপ সমন্বয়কদের ষাট-সত্তরজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন! ৫ আগস্টের পর এটাই বোধহয় সমন্বয়কদের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ সমাবেশ ছিল—এবং তাদের একত্রকরণে এই মতবিনিময় সভাটি একটা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
যদিও এতে আমার উদ্দেশ্য বা টার্গেট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়েকজন ব্যবসায়িক বন্ধুর সহায়তায় এই আয়োজনটি সম্পন্ন হয় এবং তাতে আমি মূল ভূমিকাটি রেখেছিলাম। এখানে আমার মূল টার্গেটটি ছিল—নতুন নেতৃত্বের প্রতি একটা বিশেষ প্রস্তাব। তরুণ নেতৃত্বের সামনে সেদিন একটা অনুরোধ করেছিলাম—জাতীয় নাগরিক কমিটিকে আরো কিছুটা সময় ‘সিভিল সোসাইটি’ করে রাখা হোক। কারণ ডান, বাম, মধ্যডান, মধ্যবাম সব রাজনৈতিক চাহিদা মেটানোর জন্য রাজনৈতিক দল রয়েছে।
কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে সঠিক ট্র্যাক বা জায়গাতে রাখার মতো কোনো সামাজিক শক্তি বা কোনো প্রেশার গ্রুপ আমাদের নেই! আমার প্রস্তাব ছিল—নতুন নেতৃত্বের মধ্যে যারা এখনই রাজনীতিতে যোগ দিতে চান, তারা এক্সিস্টিং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন বিএনপি, জামায়াত, এবি পার্টিÑএসবের যেকোনো একটিতে যোগ দিতে পারেন। এমনকি আমি তারেক রহমানকে এই অনুষ্ঠানের ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ দিয়েছিলাম—এই ছেলেমেয়েদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে নিন। কিন্তু কেউ আমার এই পরামর্শ কানে নেননি!
বর্তমান সরকারি দল এবং বিরোধী জোটের মধ্যে যে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে—এমতাবস্থায় জুলাই বিপ্লবে বলীয়ান জাতীয় নাগরিক সমাজের মতো সর্বজনগ্রহণযোগ্য একটা প্রেশার গ্রুপ থাকলে উভয় পক্ষ তাদের সালিশ মেনে নিতে একটা প্রেশার অনুভব করত!!
আমার মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলে আমার কোনো ক্ষোভ নেই! যেভাবে আছি, যেখানে আছিÑসেখান থেকেই ভালোভাবে চলার পরামর্শ দিচ্ছি। এসব লেখা দেখে পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো এই ভেবে সান্ত্বনা পাবে যে, আগের প্রজন্মে অন্তত কিছু মানুষ সুস্থভাবে চিন্তা করেছিল জাতির ভাগ্যটি বদলাতে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে পানি যতটুকু গড়িয়েছে, তাতে বিএনপি-জামায়াতের আগের মতো ঐক্য করা কঠিন হবে। তার চেয়ে একটি সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক গণতান্ত্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর দুই দল এখন কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বী; জামায়াত ১১-দলীয় জোটের নেতৃত্বে বিরোধী রাজনীতি করছে আর বিএনপি সরকারে।
দ্বন্দ্ব কমাতে নিচের চারটি পরামর্শ দিয়ে আজকের কলাম শেষ করব।
এক. ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধ করুন
এ ব্যাপারে খালেদা জিয়াকে অনুসরণ করুন, শেখ হাসিনাকে নয়। দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে প্রকাশ্য অপমান, কটূক্তি ও উসকানিমূলক বক্তব্য কমাতে পারস্পরিক জেন্টেলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট করুন। নিজের নাক উঁচিয়ে প্রতিপক্ষকে লুকডাউন করার মানসিকতা সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। সরকারকে যেমন বিরোধী দলকে সম্মান দেখাতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকেও সরকারি দলের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। অপ্রিয় সত্য কথা সবার স্টকেই রয়েছে। প্রতিপক্ষের ওপর এসব মিসাইল ছোড়ার আগে আরেকটু হৃদয়বান হওয়া দরকার।
দুই. জুলাই চার্টার ও সাংবিধানিক সংস্কারে একটি যৌথ সংলাপের উদ্যোগ নিন
বর্তমানে সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। কাজেই দুই পক্ষই যেসব বিষয়ে একমত, সেগুলো আগে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এখান থেকেই সমাধানের রাস্তা সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে।
একপক্ষ নতুন ঘর বানাতে চান—অন্যপক্ষ রেনোভেট করতে চান। অনেক সময় রেনোভেশন নতুন ঘরের চেয়ে বেশি নতুন হয়ে যেতে পারে। একজন ট্রাবল-শুটার হিসেবে বিষয়টিকে এভাবে দেখি। মডার্ন ম্যানেজমেন্ট এবং কনফ্লিক্ট রিজলভিং টেকনিক অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এই টেকনিক পারসোনাল কিংবা দলীয় ইগোকে ডাইজেস্ট করতে পারে। কাজেই ব্যক্তিগত বা দলীয় ইগো জলাঞ্জলি দিয়ে জাতীয় স্বার্থে এগিয়ে আসুন।
তিন. স্থানীয় পর্যায়ে সংঘর্ষ ঠেকাতে দুই পক্ষ মিলে কনফ্লিক্ট রেজল্যুশন কমিটি করুন
জাতীয় নেতাদের বক্তব্যের চেয়েও স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় উত্তেজনা বাড়াতে পারে। নেতা ‘ধইরা’ আনতে বললে কর্মীরা ‘বাইন্ধা’ নিয়ে আসে। তাছাড়া দলগুলোর ছাত্র সংগঠন খুবই স্পর্শকাতর জায়গা—ফ্র্যাজাইল আইটেম—টু বি হ্যান্ডেল উইথ কেয়ার। এ কারণেই উভয় দল থেকে পাঁচজন করে ঠান্ডা মাথার প্রজ্ঞাবান নেতাদের সমন্বয়ে একটা কনফ্লিক্ট রেজল্যুশন কমিটি (Conflict Resolution Committee) করার জোর পরামর্শ দিচ্ছি।
চার. শত্রুতা নয়—নীতিগত প্রতিযোগিতা করুন
অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, শিক্ষা, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয়ে বিএনপি সরকার কী করছে এবং জামায়াত কী বিকল্প প্রস্তাব দিচ্ছে—এই প্রতিযোগিতা সংসদ ও গণমাধ্যমে হওয়া উচিত। এতে রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক সংঘাত কমতে পারে।
৫০/৬০ বছর ধরে রক্তমাংসের মানুষের কথা না ভেবে অনেক চেতনার ভূতকে খাইয়েছি, নিজেদের অনেক সুযোগ ও সম্ভাবনা নষ্ট করেছি। এবার আসুন, সেই চেতনার ভূতদের বাদ দিয়ে রক্ত-মাংসের মানুষের প্রয়োজন এবং প্রত্যাশার দিকে মনোযোগ দিই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


