বাংলাদেশে কোরবানির পশুর চামড়া শুধু একটি মৌসুমি পণ্য নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি খাত এবং হাজারো এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীর জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, বছরের পর বছর ধরে এই খাতকে একটি অসাধু সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে, বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং তৃণমূলপর্যায়ের সংগ্রাহকদের বঞ্চিত করে চামড়াশিল্পকে আজ এমন এক সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যার পরিণতি ভয়াবহ।
একসময় কোরবানির মৌসুমে একটি ভালো মানের গরুর চামড়া ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, সেই একই চামড়া অনেক জায়গায় মাত্র তিনশো টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন মানুষ। কোথাও কোথাও আবার ক্রেতা না থাকায় চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, এমনকি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এটি শুধু একটি বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের এক নির্মম উদাহরণ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কওমি মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। দেশে অসংখ্য লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক সহায়তা আসে কোরবানির চামড়া থেকে। প্রতিবছর ছাত্র-শিক্ষকরা ঘরে ঘরে গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেন, তা সংরক্ষণ করেন এবং বিক্রির মাধ্যমে এতিম ও অসহায় শিশুদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যখন বছরের পর বছর ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায়নি, তখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। অনেক মাদরাসা লোকসানের কারণে চামড়া সংগ্রহ কার্যক্রম সীমিত করেছে, আবার অনেকেই পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাস্তবতা হলো, কোরবানির পরপরই চামড়া সঠিকভাবে লবণজাত না করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা নষ্ট হতে শুরু করে। বাংলাদেশের মতো বিশাল পরিসরে এই চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রাথমিক সংরক্ষণের কাজটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে এসেছে মাদরাসাগুলো। তারা না থাকলে গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি পর্যন্ত এত বিপুল পরিমাণ চামড়া দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব। অথচ যাদের শ্রম ও ব্যবস্থাপনার ওপর পুরো শিল্প নির্ভরশীল, তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বহু বছর ধরে সরকার এমনভাবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে, যা মূলত সিন্ডিকেটের সুবিধাই নিশ্চিত করেছে। মাঠপর্যায়ে সেই নির্ধারিত দাম এতটাই অযৌক্তিক ছিল যে, অনেক সময় একটি চামড়া সংরক্ষণে যে পরিমাণ লবণ লাগে, সেই লবণের খরচও উঠত না। ফলে মাদরাসা, এতিমখানা ও সাধারণ সংগ্রাহকদের বাধ্য হয়ে লোকসান গুনতে হয়েছে আর অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কোটি কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এ বাস্তবতা শুধু বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, এটি এতিমদের হক ক্ষুণ্ণ করারও শামিল।
এ সমস্যা সমাধানে প্রথমত, সরকারকে বাস্তবসম্মত ও লাভজনক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই মূল্য বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চামড়া সংগ্রহ ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। তৃতীয়ত, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা এবং সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ন্যায্যমূল্যে সরাসরি ট্যানারিতে চামড়া বিক্রি করতে পারে।
চামড়াশিল্প শুধু ব্যবসায়ীদের মুনাফার বিষয় নয়; এটি লাখো মানুষের জীবিকা, দেশের রপ্তানি অর্থনীতি এবং এতিম ও অসহায় শিশুদের অধিকার রক্ষার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই এই খাতকে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দিয়ে কোনোভাবেই একটি জাতীয় সম্পদকে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না।
আমরা আশা করব, সরকার বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজারে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার এই শিল্পকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেবে। সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্তই পারে দেশের বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পকে রক্ষা করতে এবং একই সঙ্গে অসহায় এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে।
লেখক : কাতারপ্রবাসী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

