ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত গত মে মাসে দেশটির বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ (cockroach) বলে অভিহিত করেছিলেন, যা সারা দেশে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত হওয়ার অর্থ হলো নিজেকে নোংরা, গুরুত্বহীন এবং চোখের আড়ালে রাখার মতো কোনো প্রাণী হিসেবে গণ্য করা। তেলাপোকা হলো একটি কুৎসিত, হাস্যকর ও প্রান্তিক প্রাণী। একে ঘৃণা করা হয়, সহজে মারা যায় না এবং এটি তথাকথিত ‘ভদ্র সমাজের’ ফাটল বা আড়ালে বাস করে। বিষ, অন্ধকার ও ঘৃণা—সবকিছুই সে সহ্য করে টিকে থাকে।
দেশের তরুণদের সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির অপমানজনক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে মে মাসেই তরুণনির্ভর দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ গড়ে ওঠে। এরপর থেকে দলটি ভারতের তরুণদের মধ্যে অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় জবাবদিহিতার অভাবসহ শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করে সিজেপি। তরুণদের এই আন্দোলন মোদি সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
সিজেপি গঠনের প্রায় দুই মাস পর গত ৬ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করে সিজেপি ও সর্বভারতীয় কয়েকটি ছাত্র সংগঠন। সিজেপির আন্দোলনের সমর্থনে পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। সেখানে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হন এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক নিজেও অনশন শুরু করেন। সোনম ওয়াংচুকের অনশনের ২১তম দিনে পুলিশ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে।
বিক্ষোভকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ভারতীয় সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন এবং পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ ভবন চত্বরে ঢুকে পড়েন। সেখানে দুপক্ষের মধ্যে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকারের কৌশল ছিল নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া, তাদের বিস্তৃতি নজরে রাখা এবং জোটটি ভেঙে পড়ার অপেক্ষা করা। কিন্তু সরকারের এই কৌশল কাজে লাগেনি। উল্টো আন্দোলনকারীরা ক্ষমতাসীনদের চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। সিজেপির চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকেও তরুণদের আরো কয়েকটি দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
মনে হচ্ছে, ভারতের জনাকীর্ণ ও অস্থির রাজনীতিতে সিজেপিকে কেবল আরেকটি ‘ভাইরাল ঝড়’ হিসেবে দেখা আর সম্ভব নয়। এটি এমন কোনো ব্যঙ্গাত্মক যুব সংগঠন নয়, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্ম নিয়েছে, রাস্তায় ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান হয়েছে এবং আবির্ভাবের মতোই দ্রুত মিলিয়ে যাওয়ার নিয়তি নিয়ে এসেছে। এই ‘তেলাপোকা’ অনেক দূর এগিয়েছে, কারণ এটি সমাজের একটি ব্যাপক ও গভীর অনুভূতিকে ধারণ করছে।
অনেক তরুণ ভারতীয়র কাছে, বিশেষ করে যারা বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যার মুখোমুখি—এই অপমানজনক মন্তব্যটি তাদের মনের অব্যক্ত অনুভূতিকেই যেন ভাষা দিয়েছে। সিজেপি সেই অপমানকেই দৃশ্যমান প্রতিবাদের শক্তিতে রূপান্তর করেছে। তারা বলল, ‘ক্ষমতার চোখে যদি আমরা এমনই হই, তবে আসুন আমরা সেই নামেই কথা বলি।’ একটি অপমানসূচক সম্বোধনই তখন তাদের গর্বের পরিচয়ে পরিণত হলো।
এটি কোনো বিপ্লবী রাজনীতি নয়, বরং এটি বিয়োগান্তক-হাস্যরসাত্মক, এমনকি প্রহসনমূলকও। কারণ ‘তেলাপোকা’ শব্দটি এমন এক ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ওপরে ওঠার বিশাল সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ‘তেলাপোকা রাজনীতি’র উদ্ভব এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুল সম্পদ ও আদর্শগত শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে এক শক্তিশালী নির্বাচনি যন্ত্র পরিচালনা করছে, সেইসঙ্গে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং বিরোধী শিবিরের বিভাজনকে ভোটে রূপান্তর করার সক্ষমতাও দেখিয়েছে।
কিন্তু এ কথা সত্য, বিজেপির জনসমর্থন মূলত একটি ‘বিশাল সংখ্যালঘু’ অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটি জাতীয় পর্যায়ে মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি সমর্থন পেয়েছে। অন্যভাবে বললে, যারা ভোট দিয়েছেন তাদের দুই-তৃতীয়াংশই মোদির নেতৃত্বে বিজেপির পুনরায় ক্ষমতায় আসাকে সমর্থন করেননি।
মোদি সরকারের ক্ষমতা কোনো প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নয়, বরং বিভিন্ন উপাদানের সমষ্টির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এসব উপাদানের মধ্যে আছে আঞ্চলিক ও জাতিগত জোট, বিরোধী দল থেকে দলবদল ও ভাঙন এবং দুটি প্রধান জাতীয় দলের মধ্যবর্তী ‘তৃতীয় শক্তি’ বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে যাওয়া।
সিজেপির আবির্ভাব এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ওপরের স্তর থেকে নির্বাচনি রাজনীতিকে স্থিতিশীল মনে হলেও তৃণমূল বা সাধারণ মানুষের কাছে তা অবিশ্বস্ত ঠেকছে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং পরীক্ষা পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা নিয়ে তরুণরা ক্ষুব্ধ। তারা এমন এক সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করছে, যখন জনরোষ প্রকাশের প্রচলিত গণতান্ত্রিক মাধ্যমগুলো, যেমন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন, গণমাধ্যম ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বিকৃতির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে অর্থনীতির প্রসঙ্গ।
কোভিড-১৯ মহামারির ফলে ভারতীয় অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতির রেশ কাটতে না কাটতেই দেখা যাচ্ছে, ৮০ কোটিরও বেশি ভারতীয় সরকারি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশের কাছে এই খাদ্য সহায়তা ক্ষুধা নিবারণ ও সংসার সচল রাখার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে রাষ্ট্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। তবে এই ন্যূনতম কল্যাণমূলক সহায়তা কোনো ‘সামাজিক চুক্তির’ প্রতিফলন নয়; বরং মহামারির সময় যেসব কাঠামোগত অনিশ্চয়তা ও দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছিল, সেগুলোর সমাধান করতে ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ এটি।
অন্যদিকে ভারতে সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটেছে তীব্রভাবে। দেশের শীর্ষ এক শতাংশ ধনী এখন যে পরিমাণ আয় ও সম্পদের মালিক, সেরকম চিত্র গত এক শতাব্দীতে ভারতে দেখা যায়নি। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটাই বর্তমানের রাজনৈতিক অর্থনীতির স্বরূপ। নিচে কল্যাণমূলক সহায়তা, ওপরে একচেটিয়া আধিপত্য এবং মাঝখানে চরম চাপে পিষ্ট এক মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ও রুদ্ধ আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণায় জর্জরিত।
ভারতে স্কুল ও উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু সরকার যাদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত সম্মানজনক ও স্থিতিশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। শিক্ষিত তরুণরাই এই বৈপরীত্যের শিকার। তাদের শেখানো হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাই সামাজিক অবস্থানের উন্নতির চাবিকাঠি, অথচ অর্থনীতি তাদের জন্য সামান্য স্বস্তির সুযোগও ঠিকমতো তৈরি করতে পারছে না।
এ কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে বিলম্ব এবং পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একটি পরীক্ষা কেবলই পরীক্ষা নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এটি সামাজিক অবস্থানের উন্নতির এক বাজি। সন্তান যাতে ভালো বেতনের সম্মানজনক চাকরি পায়, সেই আশায় অভিভাবকরা অর্থ জমান, ঋণ করেন, এমনকি জমি বিক্রি করে চড়া কোচিং ফি জোগান।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তা যেন এক গভীর ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র কেবল পরীক্ষাই সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয় না, বরং লাখ লাখ পরিবারের ত্যাগ ও প্রচেষ্টাকে উপহাসও করে। এ কারণেই ‘তেলাপোকা’র প্রতীকটি এত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সেসব মানুষের কথা বলে, যারা উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অবজ্ঞার দোলাচলে আটকে পড়েছে। কর্মহীন স্নাতক, করের বোঝা ও বাজারের দুর্বল চাহিদার চাপে পিষ্ট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সবসময় অনলাইনে থেকেও অনিশ্চয়তায় ভোগা ‘গিগ ওয়ার্কার’ (অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী) এবং সেই শিক্ষার্থী যে জানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে তার বছরের পর বছরের প্রস্তুতি বৃথা যেতে পারে। তেলাপোকা হলো সেই নাগরিক, যে টিকে থাকে, কিন্তু টিকে থাকার জন্য কোনো সম্মান বা স্বীকৃতি পায় না।
মোদির সরকার সামাজিক মেলবন্ধন তৈরি করা ছাড়াই নির্বাচনি সাফল্য অর্জনে দক্ষতা দেখিয়েছে। কিন্তু লাখ লাখ ভারতীয় তরুণের মনে যে প্রশ্নটি তাড়া করে ফিরছে, তার কোনো উত্তর এই শাসনব্যবস্থা দেয়নি। যাদের কোনো বংশগত বিশেষ সুবিধা নেই, একচেটিয়া পুঁজির মালিকানা নেই কিংবা বিদেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ নেই, তাদের ভবিষ্যৎ কী?
সিজেপিও সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এটি নতুন দলের উত্থানের চেয়ে বরং পুরনো রাজনৈতিক ভাষা ও ধারার ক্লান্তিকে বেশি করে তুলে ধরে। রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠার জন্য বিজেপিকে পরাজিত করা বা কোনো বিশুদ্ধ আদর্শ প্রচার করারও প্রয়োজন পড়ে না তরুণ প্রজন্মের নতুন ধারার এই দলটির।
এটাই হলো ‘তেলাপোকা রাজনীতি’র গভীরতর তাৎপর্য। এতে গণতান্ত্রিক চেতনা টিকে থাকে ঠিকই, তবে তা এক ক্ষয়িষ্ণু বা দুর্বল রূপে। সাধারণ ভাষায় কথা বলা যখন রুদ্ধ বলে মনে হয়, তখন এটি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের আশ্রয় নেয়। সুসংগঠিত রাজনীতি যখন ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়, তখন এটি ‘মিম’-এর রূপ ধারণ করে। এটি হাসে, কারণ ঘোর দুর্দিনে রসবোধই হলো সাহসিকতার সর্বশেষ প্রকাশ্য রূপ।
আল জাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

