‘প্রস্তুতি ম্যাচ’ বলে কি ৫৪ রানে অলআউটের ব্যর্থতাকে আড়াল করা যায়?
প্রস্তুতি ম্যাচের ফলাফল অবশ্যই চূড়ান্ত বিচারের মাপকাঠি নয়। কিন্তু ২২ ওভারে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া, তাও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করার পর, নিছক প্রস্তুতির ভুল বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও নয়। বরং ডারউইনের এই ধস বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরোনো একটি প্রশ্নকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিদেশের কঠিন কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটিং কেন বারবার একইভাবে ভেঙে পড়ে?
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের অপরাজিত সেঞ্চুরিতে ২৬৩ রান করেছিল বাংলাদেশ। এরপর প্রতিপক্ষকে ৯২ রানের লিড দিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেই বিপর্যয়। ক্যাম্পবেল থমসন নামের ২২ বছর বয়সি এক পেসারের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ যেন হঠাৎ করেই নিজেদের পরিচয় ভুলে গেল। ৮ উইকেট নিয়ে তিনি একাই ধসিয়ে দিলেন পুরো ব্যাটিং অর্ডার। তানজিদ হাসান ছাড়া কেউ দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত ইনিংস ও ৩৮ রানে হার।
প্রশ্নটা তাই শুধু এই ম্যাচ নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরো বিস্তৃত। এই ৫৪ রান কি বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাময়িক ব্যর্থতা, নাকি দীর্ঘদিনের অসুখের নতুন উপসর্গ?
উত্তরটা খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না।
২৩ বছর পরও একই ছবি
২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। হেরেছিল দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে। দুই দশকের বেশি সময় পর আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সফরে বাংলাদেশ। সিরিজ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে ডারউইনের প্রস্তুতি ম্যাচে আবারও ইনিংস ব্যবধানে হার।
সময় বদলেছে। ক্রিকেটার বদলেছে। কোচ বদলেছে। নির্বাচক বদলেছে। বদলেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবকাঠামোও। কিন্তু বিদেশের কঠিন কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যর্থতার ছবিটা কেন বদলাল না?
দেড় শতাধিক টেস্ট খেলে বাংলাদেশের জয় মাত্র ২২টি। এর মধ্যে আটটি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এখনো কোনো টেস্ট জয় নেই। আফগানিস্তান, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় মাত্র একটি করে।
বিদেশের মাটিতে বড় সাফল্যের তালিকাও খুব ছোট। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে হোয়াইটওয়াশ এবং ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে সিরিজ হারানো। এই দুটি সাফল্য অবশ্যই গৌরবের। কিন্তু এগুলো হলো ব্যতিক্রম, এগুলোকে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বলে না।
আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হিসাবটা আরো কঠিন। পাঁচ টেস্টে চার হার, জয় একটি। সেই একমাত্র জয়ও ২০১৭ সালে মিরপুরের পরিচিত স্পিনবান্ধব উইকেটে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলতে প্রায় কিছুই নেই। ২৩ বছর আগে দুটি টেস্ট, দুটি ইনিংস হার। এবার শুরু হওয়ার আগেই প্রস্তুতি ম্যাচে আরেকটি ইনিংস হার।
তাহলে ২৩ বছরে আসলে কী শিখল বাংলাদেশ?
সমস্যার গোড়া ঘরোয়া ক্রিকেট
বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই।
আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যাটাররা যে ধরনের পেস বোলিংয়ের মুখোমুখি হন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার সঙ্গে অনেক সময় কোনো মিলই থাকে না। ধীরগতির উইকেট, নিচু বাউন্স, পুরোনো বল এবং স্পিননির্ভর পরিবেশে রান করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে হঠাৎ সামনে আসে ঘণ্টায় ১৩৫ থেকে ১৪৫ কিলোমিটার গতির বল, অতিরিক্ত বাউন্স এবং সিম মুভমেন্ট।
সেখানে ব্যাটিং মানে শুধু শট খেলার দক্ষতা নয়। বল ছেড়ে দেওয়ার দক্ষতা, অফ স্টাম্পের বাইরে ধৈর্য, শরীরের কাছাকাছি আসা বল সামলানো এবং অস্বস্তিকর বাউন্সের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট সেই প্রস্তুতি কতটা দেয়? উত্তর খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। জাতীয় লিগে যদি এমন উইকেটই না থাকে যেখানে একজন ব্যাটারকে মানসম্পন্ন পেসারের বিরুদ্ধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাট করতে হবে, তাহলে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে সেই দক্ষতা হঠাৎ তৈরি হবে কীভাবে?
এই ব্যাটিং ধস নতুন কিছু নয়
ডারউইনের ৫৪ রান তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়া, বিদেশের দ্রুত ও বাউন্সি উইকেটে বাংলাদেশের টপ অর্ডার বারবার একই সমস্যায় পড়েছে। প্রথম ধাক্কাতেই উইকেট পড়ে। তারপর মিডল অর্ডারের ওপর চাপ বাড়ে। চাপ বাড়লে ভুল বাড়ে। আর ভুল বাড়লেই শুরু হয় ধস।
অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করতে পারেননি। ঘরের মাঠে যে ব্যাটারদের টেকনিক যথেষ্ট কার্যকর, বিদেশে অতিরিক্ত বাউন্স ও গতির সামনে সেই টেকনিকের দুর্বল দিকগুলো প্রকাশ পেয়ে যায়।
ডারউইনে সেটাই হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মূল পেস আক্রমণের সামনে পরিস্থিতি যে আরো কঠিন হবে, সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।
বোলিংয়ের ছবিটাও খুব স্বস্তির নয়।
বাংলাদেশের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি স্পিন। তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ দীর্ঘদিন ধরে সেই শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে নতুন বল হাতে এমন পেসার দরকার, যিনি গতি ও বাউন্স দিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটারকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারবেন।
নাহিদ রানা সেই সম্ভাবনাই দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু সফরের আগেই সাইড স্ট্রেইনের চোটে দুই টেস্ট থেকে ছিটকে গেছেন তিনি। পুরোপুরি সুস্থ হতে তার ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ লাগতে পারে।
এখানেই বাংলাদেশের আরেকটি দুর্বলতা সামনে আসে।
একজন তরুণ পেসারের অনুপস্থিতিতেই যদি পুরো আক্রমণের ভারসাম্য নড়ে যায়, তাহলে সমস্যাটা শুধু একজন খেলোয়াড়ের নয়, পুরো কাঠামোর।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তাইজুল ইসলামের চোট। প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় হাতে আঘাত পাওয়ায় প্রথম টেস্টে তার খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। দলের ফিজিও অবশ্য উন্নতির কথা জানিয়েছেন। লিটন দাসও চোট সারিয়ে দলে ফিরেছেন। কিন্তু প্রথম টেস্টে খেলার মতো নিশ্চয়তাও কি আছে তার?
তবে চোটের তালিকা পেশ করে সেটাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে ৫৪ অলআউটের ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না।
নাহিদ রানা নেই, তাই বলে ক্যাম্পবেল থমসনের সামনে ২২ ওভারে মাত্র ৫৪ রানে পুরো দল গুটিয়ে যাবে কেন? প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার মূল টেস্ট পেস আক্রমণও ছিল না। তবু বাংলাদেশের ব্যাটাররা দাঁড়াতেই পারলেন না। এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের।
কারণ কয়েক দিনের মধ্যেই সামনে আসবেন মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউডের মতো বিশ্বমানের পেসাররা। ডারউইনে যে বলের সামনে ব্যাটাররা নড়বড়ে হয়ে গেলেন, সেই পরীক্ষা তখন কয়েক গুণ কঠিন হবে।
আসল সমস্যা আত্মবিশ্বাসে, নাকি প্রস্তুতিতে?
দুটোতেই।
বিদেশে খেলতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশকে প্রায়ই দেখা যায় নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে বেশি আলোচনা করতে। উইকেট কেমন হবে, বল কতটা বাউন্স করবে, কে নেই, কে চোটে, প্রতিপক্ষ কত শক্তিশালী, এসব আলোচনাই সামনে চলে আসে।
কিন্তু বড় দলগুলো সাধারণত নিজেদের শক্তির ওপর বেশি জোর দেয়। অস্ট্রেলিয়া জানে তাদের পেস আক্রমণ শক্তিশালী। জানে তারা ঘরের মাঠে এগিয়ে। তাই বলে প্রতিপক্ষকে নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পায় না। বাংলাদেশেরও সেই মানসিকতা দরকার।
কারণ টেস্ট ক্রিকেটে ভয় নিয়ে শুরু করলে ম্যাচ জেতা কঠিন। প্রথম সেশনে ১৫০ রান করতে হবে না। কিন্তু প্রথম এক ঘণ্টা উইকেট বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে হবে, এই দলকে ভাঙতে হলে তাদের ঘাম ঝরাতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজের আগে বাংলাদেশ সেই বার্তাটা দিতে পারেনি।
ডারউইনে ৫৪ অলআউটে আসলে স্কোর নয়, একটি আয়না।
সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের বিদেশি ক্রিকেটের পুরোনো দুর্বলতা, ঘরোয়া প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা, মানসম্পন্ন পেসারের ঘাটতি এবং চাপের মুহূর্তে ব্যাটিংয়ের ভঙ্গুরতা। পেছনের ২৩ বছরে ক্রিকেটের পৃথিবী বদলে গেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। ফিটনেস বদলেছে। ব্যাটিং বদলেছে। বোলিং বদলেছে। টেস্ট ক্রিকেটের কৌশল বদলেছে। বাংলাদেশ কি বদলেছে?
দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে সেই প্রশ্নের খোঁজে বাংলাদেশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

