হুতিদের ভয়ে পথ পাল্টাচ্ছে সৌদিমুখী তেলবাহী জাহাজ

হুতিদের ভয়ে পথ পাল্টাচ্ছে সৌদিমুখী তেলবাহী জাহাজ
ছবি: বিবিসি

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণার পর লোহিতসাগরে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, হুতিদের হুমকির পর ইয়েমেন উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রসীমায় পথ পরিবর্তন করে অন্তত সাতটি তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যপোত বিপরীত দিকে ঘুরতে বাধ্য হয়েছে।

শিপ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্যে দেখা গেছে, লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ‘রোডোস’ সৌদি তেল নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাবেল মানদেব প্রণালির কাছ থেকে ঘুরে উত্তর দিকে চলে যায়। একইভাবে সৌদি আরবের জাজান বন্দর ত্যাগ করা ‘মাইকা’ নামের অপর একটি ট্যাংকারও দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করে। এ ছাড়া চীন থেকে সৌদি আরবের জেদ্দা ও অন্যান্য বন্দরের উদ্দেশে আসা বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জাহাজও এডেন উপসাগর ও আরব সাগরে পথ বদলে অবস্থান নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হুমকি ও উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ

শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে পাঠানো এক ইমেইলে হুতিরা সতর্ক করে জানিয়েছে, সৌদি আরবের কোনো বন্দরে পণ্য ওঠানো বা নামানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া তাদের আওতাধীন এলাকার যেকোনো স্থানে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী জাহাজে হামলা চালানো হতে পারে।

হুতিদের দাবি, ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দর ও বিমানবন্দরে সৌদি আরবের আরোপ করা অবরোধের জবাবেই এই পদক্ষেপ।

তবে সৌদি আরব এই অভিযোগ অস্বীকার করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজেদের জাহাজ ও বাণিজ্য সুরক্ষায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের কারণে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তাদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি লোহিতসাগরের ইয়ানবু বন্দরে স্থানান্তর করেছিল। কিন্তু নতুন করে লোহিতসাগর ও বাবেল মানদেব প্রণালি ঝুঁকিতে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক নৌ-মিশন ‘অ্যাসপিডেস’ এক বিজ্ঞপ্তিতে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ঝুঁকি না কমা পর্যন্ত লোহিতসাগর ও এডেন উপসাগর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিস-এর বিশ্লেষক রোজমেরি কেলানিক জানান, হুতিদের এই হুমকি শুধু সৌদিগামী জাহাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি পুরো আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ও যাতায়াতকে ব্যাহত করবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।

একই কথা জানিয়েছে সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার। তাদের মতে, বাবেল মানদেব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরবকে বিকল্প হিসেবে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে এশিয়ায় তেল পাঠাতে হবে, যা পরিবহন খরচ ও সময় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

সম্ভাব্য আক্রমণ এড়াতে লোহিতসাগরে চলাচলকারী অন্তত ৫০টি জাহাজ নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে ‘সশস্ত্র রক্ষী’ থাকার বার্তা স্পষ্ট করে দিয়ে যাতায়াত করছে।

তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ইওএস রিস্ক গ্রুপের বিশেষজ্ঞ মার্টিন কেলি সতর্ক করে বলেন, এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা বড় মাপের হামলায় জ্বালানি ট্যাংকার ধ্বংস হয়ে ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটতে পারে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন