অধিকৃত পশ্চিম তীরে সাত মাস বয়সি একটি ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। এ সময় শিশুটি তার মা–বাবাও ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আহত হয়েছেন।
শুক্রবার হেবরন শহরের তেল রুমেইদা এলাকায় শিশু ও তার বাবা-মাকে বহনকারী গাড়িটি লক্ষ্য করে গুলি চালায় সেনারা। নিহত শিশুর নাম স্যাম ফাহদ আবু হাইকাল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে সে মারা যায়। শুক্রবারই শিশুটির বয়স সাত মাস পূর্ণ হয়েছিল।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের দিকে একটি গাড়ি এগিয়ে আসছে ভেবে সেনারা গুলি চালিয়েছিল। তবে প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, আহতরা নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইডিএফ।
তবে সামরিক বাহিনীর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন শিশুটির বাবা ও বেথলেহেম বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ফাহদ আবু হাইকাল। ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎসকে তিনি বলেন, ‘একটি বুলেট আমার হাত ভেদ করে পেছনের সিটে মায়ের কোলে থাকা ছেলে স্যামের শরীরে লাগে।’
তিনি আরো জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় তাদের ১১ বছর বয়সি ছেলে এবং তার মা-সহ পুরো পরিবার গাড়ি নিয়ে হেবরন দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই সময় দিনের আলো ছিল এবং সেনা সদস্য স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন যে এটি একটি পরিবার। সেনা সদস্য থামার সংকেত দিলে তিনি গাড়িটি সম্পূর্ণ থামিয়ে স্টিয়ারিং হুইলে হাত তোলেন। এর পরপরই গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
শনিবার শিশুর দাফন অনুষ্ঠানে বাবা ফাহদ আবু হাইকাল বলেন, গাড়িটি সম্পূর্ণ স্থির ছিল। একটি সাত মাসের শিশুকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। তিনি এই ঘটনার তদন্ত এবং দায়ী সেনার জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) তিনি জানিয়েছেন, তার স্ত্রীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক এবং তার হৃৎপিণ্ডের কাছে বুলেটের স্প্লিন্টার রয়েছে। দাফন প্রার্থনার ঠিক আগে পরিবার থেকে মাকে তার সন্তানের মৃত্যুর খবর জানানো হয়। ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো শিশুর লাশটি তার বাবা বহন করেন। জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট এই হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করে অবিলম্বে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতার আহ্বান জানিয়েছে।
অনুরূপ এক ঘটনায় গত ১৫ মার্চ উত্তর জর্ডান উপত্যকার তামোনে একটি গাড়িতে গুলি চালিয়ে আলী বানি ওদেহ (৩৮), তার স্ত্রী ওয়াদ বানি ওদেহ (৩৬) এবং তাদের দুই সন্তান ওসমান (৬) ও মোহাম্মদকে (৫) হত্যা করে ইসরাইলি সেনারা।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা বি'ৎসেলেম জানিয়েছে, সেনারা গাড়ি থেকে অপর দুই শিশু খালেদ (১১) ও মুস্তফাকে (৮) নামিয়ে আনে এবং স্প্লিন্টারে আহত খালেদকে ঘটনাস্থলেই সহিংস জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় অ্যাম্বুলেন্স আসতেও বাধা দেওয়া হয়।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা 'ইয়েশ দিন'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের ক্ষতি করার অভিযোগে দায়ের হওয়া ২ হাজার ৪২৭টি অভিযোগের মধ্যে ১ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ২৪০ জন শিশু।
গাজায় হামলায় নিহত ৯
এদিকে শনিবার গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় নয়জন নিহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্র ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে। ইসরাইলি বাহিনী দাবি করেছে, নিহতদের একজন হামাসের 'সন্ত্রাসী সেলের কমান্ডার' ছিলেন।
গাজা শহরের জাওয়াজাত বাস্তুচ্যুত শিবিরে ড্রোন হামলায় সাতজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন।
আল-শিফা হাসপাতাল ছয়টি লাশ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে।
এছাড়া গাজা শহরের দক্ষিণ-পূর্বে আরেকটি হামলায় ৩৭ বছর বয়সি এক ব্যক্তি নিহত হন।
অন্যদিকে, দক্ষিণ গাজায় তাঁবুতে হামলায় মুহান্নাদ ওসমান ফারওয়ানা (২৫) নামের এক যুবক নিহত হন। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি, ফারওয়ানা হামাসের সামরিক শাখার একজন সেল কমান্ডার ছিলেন।
নিহতের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ ফারওয়ানা জানান, ওই দিনই মুহান্নাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। পুরো পরিবার বিয়ের উৎসবের প্রস্তুতির পরিবর্তে এখন তার জানাজায় অংশ নিচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


