যুদ্ধ থেমে গেলেও তার ক্ষত থেকে যায় বহু বছর। কখনো তা ধ্বংসস্তূপে, কখনো অর্থনীতিতে, আবার কখনো নীরবে প্রকৃতির বুকের ভেতর। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিবেশের ওপর এমনই এক দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ত উত্তরাধিকার তৈরি হচ্ছে। ওমানের উপকূলে একটি তেলবাহী ট্যাংকার দুর্ঘটনায় ব্যাপক তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সেই আশঙ্কা এখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জুনের শেষ দিকে ৮ লাখের বেশি ব্যারেল তেলবাহী ট্যাংকার ক্যারোলিন বেজেঙ্গি দক্ষিণ ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি দ্বীপে আটকে যায়। রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর নভোরোসিস্ক থেকে এপ্রিল মাসে তেল নিয়ে জাহাজটি ৩০ মে সুয়েজ খাল অতিক্রম করে। এর আগে ৮ জুন ইয়েমেন উপকূলের কাছে বিস্ফোরণের শিকার হয় এটি। হামলার দায় এখনো কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠন স্বীকার করেনি।
বিস্ফোরণের চার দিন পর জাহাজটির নাবিকদের উদ্ধার করা হলেও উত্তাল সাগরে ট্যাংকারটি হালানিয়াত দ্বীপপুঞ্জের আল-কিবলিয়াহ দ্বীপের পাথরে গিয়ে আটকে যায়। দ্বীপটি ওমানের একটি প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার অংশ। সেখানে সোকোত্রা করমোর্যান্টসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও হাম্পব্যাক তিমির বিচরণ রয়েছে। দুর্ঘটনার পর ট্যাংকার থেকে বিপুল পরিমাণ তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা ইতোমধ্যে ওমানের মূল ভূখণ্ডের ‘টার্টল কোস্ট’ এলাকার সৈকতে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
ওমানের ন্যাশনাল কমিটি ফর ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে, তারা ট্যাংকার আটকে যাওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি ও এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির সরকারের হিসাবে তেলের ছড়িয়ে পড়া এলাকা প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার—যা নিউইয়র্ক শহরের আয়তনের প্রায় অর্ধেক।
যুদ্ধের কার্বন নিঃসরণও ভয়াবহ
তেল ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতির সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলেও এর প্রভাব আরো অনেক গভীর। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি ও ক্লাইমেট অ্যান্ড কমিউনিটি ইনস্টিটিউটের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, ইরান যুদ্ধের প্রথম ১৪ দিনেই ৫০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ হয়েছে।
গবেষকদের হিসাবে, এই পরিমাণ নিঃসরণ আইসল্যান্ডের এক বছরের মোট কার্বন নিঃসরণের সমান। একই সময়ে উৎপন্ন কার্বনের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ পেট্রোলচালিত গাড়ি এক বছরে যে পরিমাণ নির্গমন করে তার সমতুল্য। এর ফলে জলবায়ুর যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।
গবেষণায় সামরিক অভিযান, অবকাঠামো ধ্বংস, জ্বালানি ও তেল স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব ধরনের নিঃসরণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির মানব ভূগোলবিদ ও রাজনৈতিক পরিবেশবিদ বেঞ্জামিন নেইমার্ক বলেন, সশস্ত্র সংঘাত থেকে সৃষ্ট নিঃসরণ বৈশ্বিক জলবায়ু নীতিতে এখনো অনেকটাই অদৃশ্য। এগুলো খুব কমই হিসাব করা, প্রকাশ করা বা আলোচিত হয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত চালিকাশক্তি সম্পর্কে বিশ্ব বাস্তবের তুলনায় কম ধারণা পাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের কারণে সরাসরি নিঃসরণ মোট কার্বন নিঃসরণের মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি। সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট ‘এম্বডিড কার্বন’ থেকে।
ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনা ধ্বংসের কারণে প্রায় ১৮ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। যুদ্ধ ও সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিমানের জ্বালানি থেকে আরও প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টন এবং ধ্বংস হওয়া জাহাজ ও বিমানের ‘এম্বডিড কার্বন’ থেকে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার টন নিঃসরণ হয়েছে।
এর আগে একই গবেষকরা জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে ৩ কোটি টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, যা ২০২৪ সালে জর্ডানের মোট কার্বন নিঃসরণের কাছাকাছি।
সমুদ্রতলে শতবর্ষের বিষ
যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতির কিছু চিহ্ন আবার এত দীর্ঘস্থায়ী যে, সংঘাতে অংশ নেওয়া মানুষের মৃত্যুর বহু দশক পরো তার প্রভাব থেকে যায়। ২০১১ সালে ইরাকের যুদ্ধবিধ্বস্ত তেলশিল্পকে সমুদ্রবন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য নতুন একটি পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছিল। পারস্য উপসাগরের সমুদ্রতলে পাইপলাইনের পথে কয়েকটি অস্বাভাবিক স্তূপ শনাক্ত করেন জরিপকারীরা।
ডুবুরিরা সেখান থেকে মরিচায় ঢাকা একটি ধাতব বস্তু উদ্ধার করলে জানা যায়, সেটি একটি বিস্ফোরিত আর্টিলারি শেলের অংশ। পরে ন্যাটোর সহায়তাপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে তৈরি সাদা ফসফরাসের একটি গোলা।
তদন্তে জানা যায়, সমুদ্রতলে এমন আরো প্রায় ৪ হাজার গোলা পড়ে রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত হিসেবে থাকা এসব গোলা প্রায় এক শতাব্দী আগে আরব উপসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলো প্রবালের স্তরে আবৃত হয়ে সমুদ্রতলের অংশে পরিণত হয়েছে।
সাদা ফসফরাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় বাতাসের সংস্পর্শে এলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জ্বলে উঠতে পারে। ফলে পুরোনো গোলাগুলো সরিয়ে ফেলার পরিবর্তে পাইপলাইনের পথ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই বিষাক্ত অস্ত্রের স্তূপ আজও সমুদ্রতলে পড়ে আছে।
১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩-২০১১ সালের ইরাক যুদ্ধের বিস্ফোরক ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ছোড়া বা বাধা পাওয়া অসংখ্য রকেট, ডুবে যাওয়া জাহাজ ও বিধ্বস্ত উড়োজাহাজও এখন উপসাগরের সমুদ্রতলে যুক্ত হচ্ছে। এগুলো সামুদ্রিক প্রাণী ও উপকূলীয় পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করতে পারে।
তেল পরিষ্কারে বড় আন্তর্জাতিক অভিযান
এদিকে ক্যারোলিন বেজেঙ্গি থেকে ছড়িয়ে পড়া তেল নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্ধার ও পরিষ্কার অভিযান শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রে জানিয়েছে, জাহাজটি উদ্ধার এবং তেল ছড়িয়ে পড়ার ক্ষতি মোকাবিলায় তাদের নিয়োগ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, উদ্ধারকারী জাহাজ, উড়োজাহাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক অভিযান চলছে। ১০০ টনের বেশি সরঞ্জাম নিয়ে বিশেষজ্ঞ দলও মোতায়েন করা হয়েছে। ওমানের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সহায়তায় বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে জাহাজে উঠে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ট্যাংকার এবং এর কার্গো স্থিতিশীল করার কাজ শুরু করেছেন।
অ্যামব্রের গ্লোবাল রেসপন্স বিভাগের পরিচালক এড উলাস্টন বলেন, খারিফ মৌসুমের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে তারা দিন-রাত কাজ করছেন।
পরিবেশবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল উপকূলে পৌঁছানোর আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সমুদ্র থেকে তেল সংগ্রহে বুম ও পাম্প ব্যবহার এবং প্রয়োজন হলে আকাশপথে তেল ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক প্রয়োগের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এডিনবার্গের হেরিয়ট-ওয়াট ইউনিভার্সিটির পরিবেশগত মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক টনি গুতিয়েরেজ সতর্ক করে বলেছেন, তেল যদি উপকূলের অগভীর পানিতে পৌঁছে যায়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এমনকি বছরের পর বছর ধরে সেখানে তেলের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।
১৯৮৯ সালে আলাস্কার উপকূলে এক্সন ভ্যালডিজ ট্যাংকার দুর্ঘটনায় ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ব্যারেল তেল ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই দুর্ঘটনার এক দশক পরও সমুদ্র ও উপকূলে তেলের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুদ্ধ থামলেও থেকে যাবে পরিবেশগত ক্ষত
ক্যারোলিন বেজেঙ্গি দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির অবরোধের কারণে জাহাজ চলাচলের বীমা ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। নতুন করে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এই ব্যয় আরো বাড়তে পারে।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। যুদ্ধের সময় ধ্বংস হওয়া স্থাপনা, পোড়া জ্বালানি, ডুবে যাওয়া জাহাজ, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজ, সমুদ্রতলে পড়ে থাকা গোলাবারুদ এবং তেল ছড়িয়ে পড়া—সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিবেশের ওপর তৈরি হচ্ছে এক জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ।
অর্থাৎ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অস্ত্রের শব্দ থেমে যাওয়ার পরও এর কার্বন নিঃসরণ, বিষাক্ত বর্জ্য ও সমুদ্রদূষণের প্রভাব বহু বছর, এমনকি শতাব্দী ধরেও টিকে থাকতে পারে। ওমানের উপকূলে চলমান তেল দূষণ সেই দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত বিপর্যয়েরই আরেকটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
সূত্র: আরাব নিউজ
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


