মোবাইলের বাজারে অস্থিরতা থামছেই না। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা দিয়ে গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের আন্দোলন, ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ এবং হঠাৎ মোবাইলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংকটের মুখে পড়েছে এই খাত। এর মধ্যে এনইআইআর বাস্তবায়নের পরই ‘মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (এমআইওবি) ব্র্যান্ডের মোবাইলের দাম বাড়িয়েছে। এই সমিতি বিটিআরসিকে এনইআইআর বাস্তবায়নের জন্য ৪৬ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। বিটিআরসি জানিয়েছে, এনইআইআর বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের কোনো বাজেট না থাকার কারণে তারা রাষ্ট্রের স্বার্থে ওই অনুদান নিয়েছেন।
অন্যদিকে এই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। গত বৃহস্পতিবার তারা ২০ দিন পর ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে দোকান খুলেছেন। তারা বলেছেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং উচ্চ আদালতের জারি করা রুলের ওপর আস্থা রেখে দোকান বন্ধ রাখার কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আন-অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট বন্ধ হবে না বলেও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করছেন তারা। তারা ১৫ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। তারা জানিয়েছেন, অনেক ব্যবসায়ীর দোকান ও গুদামে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার ফোন রয়েছে। এনইআইআর বাস্তবায়ন হলে এসব ফোন আর ব্যবহার হবে না। এতে তারা পথে বসে যাবেন।
ব্র্যান্ডের মোবাইল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ মোবাইলের দাম বাড়েনি। ২০২৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে। দাম বাড়ার হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক স্মার্টফোন শিল্পে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই মেমোরি চিপের বাড়তি দামের কারণে স্মার্টফোনের খুচরা মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, স্মার্টফোন এখন আর শুধু বিলাসী পণ্য নয়। এটি এখন দেশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। যোগাযোগের পাশাপাশি অফিসের কাজ, পড়াশোনা, ডিজিটাল লেনদেন, সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন এবং অনলাইন কেনাকাটার মতো নানা কাজে স্মার্টফোনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। ক্রেতারা এখন এমন ডিভাইস চান, যা দামে সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ভালো পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম। বাংলাদেশের মতো মূল্যসংবেদনশীল বাজারে গ্রাহকরা দামের সঙ্গে ফিচারের ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং স্মার্টফোনকে বিলাসিতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্মার্টফোনের দামে চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় স্মার্টফোনের দাম বাড়ানো হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে নেপালেও নতুন দাম কার্যকর হয়। বাংলাদেশে ২০২৬ সাল থেকে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বর্তমানে বাজারের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে স্মার্টফোনের দাম গড়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
মোবাইল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মেমোরি চিপ সংকটের বড় একটি কারণ হলো উৎপাদিত মেমোরির উল্লেখযোগ্য অংশ এখন এআই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামোর দিকে চলে যাচ্ছে। স্মার্টফোন শিল্পের জন্য মেমোরি সরবরাহ তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের স্মার্টফোনে অন-ডিভাইস এআই ফিচার যুক্ত হওয়ায় বেশি র্যাম ও শক্তিশালী প্রসেসরের প্রয়োজন হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, মধ্যম মানের স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রিমিয়াম স্মার্টফোনগুলো তুলনামূলকভাবে এই চাপ সামাল দিতে পারলেও সেগুলোর উপকরণ খরচও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়া কারণে দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, চার জিবি র্যাম ও ৬৪ জিবি রমের শাওমি রেডমি এ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে বিক্রি হচ্ছিল ১০ হাজার ৯৯৯ টাকায়। ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে খুচরা বিক্রেতারা সেটি সংগ্রহ করতেন ১০ হাজার ৪২০ টাকায়, অর্থাৎ মার্জিন ছিল ৫৭৯ টাকা। তবে বর্তমানে নতুন মূল্য তালিকায় একই ডিভাইস সংগ্রহ করতে হচ্ছে ১১ হাজার ৯৭৫ টাকায় এবং গ্রাহকের কাছে বিক্রি হবে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৯৯৯ টাকায়। এছাড়া রেডমি নোট ১৪প্রো ৪জি (৮/২৫৬) মডেলের দাম ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ২৮ হাজার টাকা, বর্তমানে সেটি ৩৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভিভো ওয়াই২১ডি (৮/১২৮) মডেলের দাম ২১ হাজার থেকে বেড়ে ২৩ হাজার টাকা হয়েছে। এছাড়া ভিভোর অন্তত চারটি মডেলের দাম এক থেকে দুই হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। ইনফিনিক্সের ‘স্মার্ট ১০ (৪/৬৪)’ মডেলের দাম ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। হট ৬০আই (৬/১২৮) মডেলের দাম ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার আর ৮/২৫৬ ভ্যারিয়েন্টের দাম দুই হাজার টাকা বেড়েছে। রিয়েলমি হ্যান্ডসেটের গড় মূল্যও এক হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। নোট ৭০ (৬/১২৮) মডেলের দাম ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার, ‘সি৮৫ প্রো (৬/১২৮)’ মডেলের দাম ২১ হাজার থেকে বেড়ে ২৩ হাজার টাকা হয়েছে। স্যামসাং ডিভাইসেরও দাম বেড়েছে। গ্যালাক্সি এ২৬ ৫জি (৮/১২৮) মডেলের দাম ৩৪ হাজার থেকে বেড়ে ৩৮ হাজার টাকা হয়েছে। স্যামসাংয়ের অন্তত দুই ডজন মডেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়ানপ্লাসও চারটি মডেলের দাম বাড়িয়েছে।
সাধারণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৭টি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ফোন আমদানি করে থাকে। সরকার এই সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করার জন্য এনইআইআর বাস্তবায়ন করছে। এরপরই মোবাইলের দাম বেড়েছে। এ প্রকল্পের ফলে প্রায় ২০ হাজার গ্রাহক পথে বসেছেন। এজন্য পুলিশি হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তার সত্ত্বেও আন্দোলন করে যাচ্ছেন গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
এদিকে টানা ২০ দিন বন্ধের পর অবশেষে দোকান খুলেছেন সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা। অবশ্য তারা দোকান খুললেও বিক্রি বন্ধ রেখেছেন অফিসিয়াল স্মার্টফোন তথা আনুষ্ঠানিক উপায়ে বাজারজাত করা ডিভাইস। গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকান খুললেও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন তারা। আর সেই প্রতিবাদ কর্মসূচিরই অংশ হিসেবে অফিসিয়াল স্মার্টফোন বিক্রি স্থগিত রাখা হয়েছে।
গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং উচ্চ আদালতের জারি করা রুলের ওপর আস্থা রেখে দোকান বন্ধ রাখার কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আন-অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট বন্ধ হবে না বলেও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করছেন তারা। তারপরও ১৫ মার্চ থেকে এসব বিক্রীত স্মার্টফোনে মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল না থাকলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। গত ১ জানুয়ারি এনইআইআর ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সেদিন আন-অফিসিয়াল স্মার্টফোন বিক্রি করতে গিয়ে ডিভাইসে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার সমস্যা দেখতে পান মোবাইল বিক্রেতারা।
বিষয়টি জানতে চাইলে আন্দোলনরত মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম মোল্লা জানান, এনইআইআর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের কথা শোনেনি। এতে গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
এ বিষয়ে এমআইওবি সভাপতি জাকারিয়া শহীদ জানান, ‘মোবাইল তৈরির বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোর কারণে মোবাইলের দাম বেড়েছে।’