হোম > আমার দেশ স্পেশাল > অনুসন্ধান

কাঠের ট্রলারে পাচার, সাগরে ডুবে মৃত্যু

আনছার হোসেন, কক্সবাজার

আন্দামান সাগরের উত্তাল ঢেউ আবারও সামনে এনেছে মানব পাচারের এক নির্মম বাস্তবতা। মালয়েশিয়ায় উন্নত জীবনের আশায় যাত্রা করা অন্তত ২৮০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে বহনকারী একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার ঘটনায় জীবিত উদ্ধার হয়েছেন মাত্র ৯ জন। বাকিদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। অথচ এই ভয়াবহ ঘটনার পরও পাচারচক্রের মূল হোতারা রয়ে গেছে আড়ালে; উল্টো উদ্ধার হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগীকেই করা হয়েছে আসামি।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত। সীমান্তবর্তী ও উপকূলীয় এই অঞ্চলের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট ব্যবহার করে বিরতিহীনভাবে মালয়েশিয়াগামী ট্রলার ছেড়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব যাত্রা ঘটে নীরবে, লোকচক্ষুর আড়ালে।

দালালরা আড়ালে, ভুক্তভোগীরাই আসামি

স্থানীয়রা জানান, নানা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানব পাচারচক্রের দালালদের দেওয়া প্রলোভনে পড়ে বেকার তরুণরা এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়ান। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দালালরা তাদের সাগরপথে পাঠালেও দুর্ঘটনার দায় এড়িয়ে আড়ালে রয়ে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে, ট্রলারডুবির পর উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে তিন রোহিঙ্গাকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হলেও ছয় বাংলাদেশিকে দালাল হিসেবে অভিযুক্ত করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ বলছে, কোস্ট গার্ডের দেওয়া মামলার ভিত্তিতেই তারা ব্যবস্থা নিয়েছে।

যেভাবে দুর্ঘটনা

গত ৪ এপ্রিল রাতে উখিয়া ও টেকনাফ উপকূলের বিভিন্ন স্থান থেকে ছোট নৌকায় যাত্রীদের গভীর সাগরে নিয়ে একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। কয়েকদিন যাত্রার পর আন্দামান সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রলারে নারী ও শিশুসহ অন্তত ২৮০ জন ছিলেন। এদের অধিকাংশই বাংলাদেশি, অন্যরা রোহিঙ্গা। বাংলাদেশিদের সবাই কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। দুর্ঘটনার পর তারা পানির বোতল ও তেলের ড্রাম ধরে দুই দিন সাগরে ভেসে থাকেন। পরে একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ তাদের উদ্ধার করে।

উদ্ধার পাওয়া লোকজনের মধ্যে আটজন পুরুষ ও একজন নারী। তারা হলেন— কক্সবাজার শহরতলীর শান্তি পাড়ার হামিদ, সায়াদ আলম, আকবর, টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার সোহান উদ্দিন ও বড়বিল এলাকার তোফায়েল আহমেদ, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের হৃদয়, উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রফিকুল ইসলাম, রাহেলা বেগম ও ইমরান। এই ৯ জনের শেষ তিনজন রোহিঙ্গা। পরে তাদের সবাইকে কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে টেকনাফ থানা পুলিশ ও কোস্ট গার্ড ট্রলারডুবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারলেও উদ্ধার পাওয়া ৯ জন ছাড়া বাকিদের কী পরিণতি হয়েছে তা জানাতে পারেনি।

কোস্ট গার্ড বিবৃতিতে জানায়, ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি পতাকাবাহী একটি জাহাজ আন্দামান উপকূল থেকে সাগরে ভাসতে থাকা ৯ জনকে উদ্ধার করে কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজে হস্তান্তর করেছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে টেকনাফ থানায় সোপর্দ করার পর পুলিশ আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে।

পাচারের কৌশল

জানা গেছে, পাচারকারীরা যাত্রীদের আগে টেকনাফের রাজারছড়া পাহাড়সহ বিভিন্ন পাহাড়ি আস্তানায় এনে আটকে রাখে। তরুণদের ভালো চাকরির প্রলোভন এবং রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই যাত্রায় যুক্ত করা হয়।

উদ্ধার হওয়া উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে টেকনাফে নিয়ে যায়। পরে রাজারছড়া এলাকার একটি পাহাড়ে বন্দি করে রাখে। সেখানে আরো ৫০-৬০ জন লোক ছিল। গভীর রাতে তাদের একটি কার্গো বোটে তোলা হয়।

গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট নৌকায় তাদের মাঝসাগরে একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। শতাধিক রোহিঙ্গাসহ ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

যেভাবে ডুবে যায় ট্রলার

রফিকুল ইসলাম আরো জানান, টানা চারদিন সাগরে চলার পর ৯ এপ্রিল আমরা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছাই। ওই সময় বোটের মাঝি ও তার লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বোটের লোকজন যাত্রীদের অনেককে জিম্মি করে সেখানকার বরফঘরে আটকে রাখে।

তিনি দাবি করেন, এই ঘটনার আধাঘণ্টা পরই ট্রলারটি ডুবে যায়। আমিসহ কয়েকজন যাত্রী পানির বোতল ও তেলের ট্যাংকি ধরে দুদিন সাগরে ভাসতে থাকি। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে।

স্বজনদের আহাজারি

এদিকে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজদের স্বজনদের ঘরে ঘরে চলছে শোকের মাতম। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা খণ্ডিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে তারা দিন কাটাচ্ছেন। সময় যত গড়াচ্ছে, বেঁচে ফেরার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্যে মানব পাচার চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে পাচারকারীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ট্রলারডুবির ঘটনার পর দালাল হিসেবে টেকনাফের শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিন, সৈয়দ উল্লাহ, ইব্রাহিম, আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, শফিক, মোহাম্মদউল্লাহ, মোজাহের মিয়া ওরফে গোরামিয়া, সায়াদ আলমসহ অনেকের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। এদের অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদের আসামি না করে ডুবে যাওয়া ট্রলারের যাত্রীদের আসামি করে কারাগারে পাঠিয়েছে।

উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিরাই উল্টো আসামি

ফিরে আসা আরেকজন টেকনাফে হোয়াইক্যং এলাকার সোহান উদ্দিন। তার বাবা শামসুর আলম বলেন, সোহানের বন্ধু এনায়েত খেলার কথা বলে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। পরে জানতে পারি, তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, শনিবার রাতে টেকনাফ থানা থেকে খবর পেয়ে সেখানে আমার ছেলেকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পাই। তার সঙ্গে নারীসহ আরো আটজন ছিল। সবার অবস্থাই ছিল নাজুক। আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বলেন, সাগর থেকে উদ্ধার করে তাদের থানায় আনা হয় এবং পরে আদালতে পাঠানো হয়। রোহিঙ্গাদের ছেড়ে দিলেও বাংলাদেশি ছয়জনকে দালাল হিসেবে মামলায় আসামি করা হয়েছে।

টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, কোস্ট গার্ড যেভাবে মামলা দিয়েছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রকৃত দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনাটি দেশের বাইরে ঘটায় তথ্য সংগ্রহে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তিনি এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জনপ্রতিনিধিরা যা বলছেন

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে যাত্রীবাহী ট্রলারডুবির ঘটনায় ৯ জন উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই এলাকায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মানুষের ছোটাছুটি বেড়েছে। অনেক পরিবার আমার কাছে এসে তাদের প্রিয়জনদের সন্ধান চাইছেন।

তিনি বলেন, শাহপরীর দ্বীপ থেকেই ২০-৩০ জন নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছি এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছি।

বারবার একই কাহিনি, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয় না

টেকনাফের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মতে, এলাকাভিত্তিক দালালরা তরুণ সমাজকে প্রভাবিত করে কিছুদিন পরপরই মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ট্রলারে মানুষ পাচার করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব দেখেও দেখে না।

টেকনাফের সাবরাং এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, কিছুদিন পরপরই শুনি, টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে মালয়েশিয়ায় মানুষ পাচার হচ্ছে। বিপদও ঘটে। তারপরও দালালদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অ্যাকশন দেখা যায় না।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, হরহামেশা সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানুষ পাচার হলেও মাঝে মাঝে কিছু মানুষ উদ্ধারের খবর শোনা যায়। কিন্তু দালালরা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পাইলটদের দ্বন্দ্বে অস্থির বিমান

সিন্ডিকেটের হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

১৮ মাস পার হলেও অগ্রগতি নেই জুলাই বিপ্লব সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর

এবার নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রচারণা নেই

নির্বাচন ভন্ডুলে মাঠে নেমেছে নয়াদিল্লি

‘ব্যক্তিগত বিচারের ভিত্তিতে’ গুম করতেন সিটিটিসির আহমেদুল