জুলাই বিপ্লবে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়। বিপ্লবের দেড় বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। সবার প্রত্যাশা—অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে গণতন্ত্রকে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করা হোক। তবে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে।
সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক যে যাত্রা শুরু হয়েছে তা বর্তমান মেয়াদেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। অন্যদিকে বিরোধী দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতন্ত্রের পথে মাত্র যাত্রা শুরু করেছে দেশ। বিএনপি সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে এটি আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন অনেকে।
পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়ার এই পরিস্থিতিতে আজ ১৫ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। জাতিসংঘ-ঘোষিত এই দিবসটি ২০০৮ সাল থেকে সদস্যভুক্ত সব দেশে পালিত হয়ে আসছে। ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬২তম অধিবেশনের ৭ নম্বর রেজল্যুশনে এই দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এ বছর দিনটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মানবাধিকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনা’। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি বিশেষ আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া গণতন্ত্র সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়ে বিরোধীদল তীব্র আপত্তি তুলেছে। এসব আইনের সমালোচনা হচ্ছে মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও বিশিষ্টজনদের মাঝেও।
বর্তমান সরকারের মেয়াদে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালুর আশা
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস সামনে রেখে দেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান এমপি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের পর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এসেছে দেশ। এখন মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে, মতামত দিতে পারছে, সাংবাদিকরাও স্বাধীনভাবে লিখতে পারছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা প্রকাশের ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তাই আগামীতে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে বলে আশা করছি। আমরা যাত্রা শুরু করেছি, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক-সব জায়গায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু হবে বলে আশা করছি।
গণতন্ত্রের স্বার্থেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন
তবে ভিন্ন মত প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় মুখপাত্র ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে, গণতান্ত্রিক নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, নতুন নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে এসব ভালো দিক। তবে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এই রায় বাস্তবায়নে সরকারের নানা টালবাহানা দেখা যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এটা বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে যে দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, তারা দেশ শাসন করছে। তার মানে এই নয় যে জনগণ তাদেরকে ৫ বছরের জন্য রাজা বানিয়েছে। জনগণ জুলাই সনদ ও যে মেনিফেস্টো দেখে তাদের ভোট দিয়েছে, গণতন্ত্রের স্বার্থে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
নাজিবুর রহমান আরো বলেন, বিএনপির মেনিফেস্টোতে বলা হয়েছিল-সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিরোধীদলকে দেওয়া হবে। জুলাই সনদেও এটা আছে। কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তা দেয়নি।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যহত হয় আইসিটি কালো আইনের মাধ্যমে। নতুন করে সাইবার সিকিউরিটি আইন করে আবার সেই স্বাধীনতা যেন বাধাগ্রস্ত না করা হয়।
সব দলকে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে হবে
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ এমপি বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর গণতন্ত্র যাত্রা শুরু করেছে মাত্র। এখনো গণতন্ত্র সেই মানে পৌঁছায়নি। আরো অনেক উন্নতি দরকার।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়নি, এখনো দলীয়করণ পর্যায়ে আছে। আইনের শাসন কোন পর্যায়ে যায়নি। মানবাধিকার কমিশন, বিচারালয় ও নির্বাচন কমিশন খুব দুর্বল। ফলে গণতন্ত্রও খুব দুর্বল অবস্থায় আছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সব দলকেই নিজেদের দল থেকে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র ও দলকে আলাদা হিসেব না করে সবার হিসেবে চিন্তা করতে হবে।
বিএনপি সরকার গণতন্ত্রের প্রতীক
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার গণতন্ত্রের প্রতীক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জনগণের জন্য যা করেছেন, গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন নেত্রী হিসেবে, গণতন্ত্রের মা হিসেবে তিনি স্বীকৃতি লাভ করেছেন। জনগণের দীর্ঘদিনের আশা পূরণ করার লক্ষ্যে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে।
তিনি বলেন, আমাদের গণতন্ত্র অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে, গণতন্ত্রের যাত্রা কখনো বন্ধ থাকতে পারে না। যেখানে গণতন্ত্রের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে, সেখানে নানা ধরনের অভ্যুত্থান ও আন্দোলন হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মায়ের কাছ থেকে এবং দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে সবকিছু দেখেছেন। এজন্য দেশের মাটি স্পর্শ করার পর তিনি বলেছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। তিনি জনগণের প্রতি ভালোবাসায় রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
দেশে গণতন্ত্রের খোলস রয়েছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, দেশে প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের একটা খোলস রয়েছে। যদি জবাবদিহিমূলক সরকার না থাকে, সংসদে ও নাগরিক সমাজে গ্রহণযোগ্যতা না থাকে, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে না, গুম করা হবে-এমন আইন করা হলে গণতন্ত্র থাকে কীভাবে? সবক্ষেত্রে দলীয়করণ করা হচ্ছে, এটা গণতন্ত্র নয়, গণতন্ত্রের খোলস।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর যা দেখছি, এমনকি ভারতেও যেটা ছিল, সেরকম গণতন্ত্র আমাদের দেশে কোনদিন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংসদে সংবিধান পরিবর্তনের কথা ছিল হয়নি, প্রধানম্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতা রয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি যা কিছু ইচ্ছা করতে পারে। সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্বে বিরোধীদল নেই।
তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্রের প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে সরকারের জবাবদিহিতা, আইনের শাসন নেই। হাসিনা গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে ফেলেছিল, সেগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে না। বরং পুরানো পথেই হাটছে সরকার। নামমাত্র একটি নির্বাচন হলেও তা গণতন্ত্রের খোলস। জুলাই গণহত্যার বিচার হচ্ছে না, ন্যায়-বিচারও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। সবমিলিয়ে হতাশা ছাড়া আর কিছুই নেই।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে বিএনপি : ডা. শফিক
‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে গতকাল সোমবার গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণতন্ত্র কেবল সরকার গঠনের কোনো সাময়িক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান ভিত্তি। গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকলে একটি সমাজ স্বৈরাচার, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থেকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। জনগণ ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, সামাজিক সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তারা ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে।
বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত করেছে। এই বিপ্লব ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে জাতির প্রত্যাশা বৈষম্যমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গঠন করতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, দেশে ইনসাফ, সততা এবং মানবিক মূল্যবোধনির্ভর বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের এই বিশেষ দিনে গণতন্ত্রকে সুসংহত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে জামায়াত দেশবাসীর নিকট প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছে। এই লক্ষ্যে জামায়াত দেশে সমতা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিকে আর কোনোভাবেই গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মতো অভিশাপের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না।