দেশের ভূমিহীন ও নদীভাঙনে দুর্গত ২০ হাজার পরিবারকে খাসজমিতে পুনর্বাসনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বেশ কয়েকবার মিটিংয়ের পরও পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে ঘর নির্মাণে দেখা দিয়েছে সংশয়। ঝুলে আছে হাজার হাজার ভূমিহীন পরিবারের ভাগ্য।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম তৃতীয় ধাপের প্রকল্প বাস্তবায়নে আশার আলো দেখছে না সংশ্লিষ্টরা। ‘ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ছিল জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০৩০ পর্যন্ত। যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। তবে এই প্রকল্পে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ধরার অভিযোগ করা হয়। বেশ কয়েকটি মিটিং হওয়ার পর বাজেট কমিয়ে ৭৬০ কোটি অগ্রিম ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গুচ্ছগ্রাম তৃতীয় ধাপের প্রকল্পটির ২০২৪ সালের এপ্রিলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। প্রকল্পটির প্রথমে বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৫ নির্ধারণ করা হয়। পরে বাজেট অনুমোদন নিয়ে জটিলতায় নতুন সময় ধরা হয়েছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারি। এখন বাজেট নিয়ে আবারও রিভিউ করছে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ।
সূত্র আরো জানায়, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রকল্পের পদ ও জনবল নির্ধারণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় প্রকল্পটির জনবল কাঠামো অনুমোদিত হয়। পরের মাসে দ্বিতীয় সভায় অনুমোদিত জনবল কাঠামো ও প্রকল্প যাচাই কমিটির সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়।
পরে ওই বছরেই পুনর্গঠিত ডিডিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো করা হয়। আরএডিপির সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ ফেরত দেয়।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ৬৪ জেলায় খাসজমিতে গুচ্ছগ্রাম তৈরি করে সেখানে ভূমিহীন ও নদীভাঙনে দুর্গত পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। অবস্থান অনুযায়ী কোথাও ২০টি, কোথাও ৪০টি আবার কোথাও ৬০টি পরিবার নিয়ে গুচ্ছগ্রাম তৃতীয় ধাপ গঠন করা হবে। এতে দুই কক্ষবিশিষ্ট তিন ধরনের ঘর নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষা ও সুপেয় পানির সুবিধা দেওয়া হবে। কক্ষগুলো ২০০ বর্গফুটের হবে।
পুনর্বাসিত পরিবারগুলোকে আর্থসামাজিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে আয়বর্ধক কাজের জন্য প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থাও করা হবে। যে বসতভিটা দেওয়া হবে তার দলিল হস্তান্তর করবে সরকার। প্রকল্পের আওতায় পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি করা হবে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় বন্যা ও নদীভাঙন এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রতি বছর অনেক পরিবার নতুন করে ভূমিহীন হচ্ছে। দেশে খাসজমি অপ্রতুল হওয়ায় ১৯৮৭ সালের দিকে সরকার গুচ্ছগ্রাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায় ১ হাজার ৪৭০টি ভূমিহীন পরিবারকে চারটি গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়। এরপর ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৮৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ চলেছে। এই সময়ের মধ্যে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৩টি পরিবারকে সরকারি খাসজমিতে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
গুচ্ছগ্রাম তৃতীয় ধাপের প্রকল্পটি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক পর্যায়ের দরিদ্র মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এটি পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে কয়েকবার বাজেট রিভিউ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানান প্রশ্ন।
যে কারণে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবে (ডিপিপি) বছরভিত্তিক ব্যয় বিভাজন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘প্রীতি রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড’ এই সমীক্ষা করেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পিইসি সভায় প্রশিক্ষণ ও ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অন্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করেই ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
এ ছাড়া আগের পিইসি সভায় প্রকল্পের জন্য দুটি গাড়ি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী ব্যয় প্রাক্কলন করে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়নি। গাড়ি দুটির মধ্যে জিপের মাসিক খরচ ১ লাখ ৭৬ হাজার এবং মাইক্রোবাসের খরচ দেড় লাখ টাকা ধরা হয়েছিল।
পুনর্গঠিত ডিপিপিতে চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারের জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এখানে চারটি গাড়ির কথা বলা হয়েছে। তবে এই গাড়িগুলো কী ধরনের হবে, তার বিস্তারিত কোনো তথ্য ডিপিপিতে নেই।
পরিকল্পনা কমিশন আরো জানায়, ডিপিপিতে অধিকাল ভাতা ৫ লাখ এবং সম্মানী ভাতা ৩৩ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আপ্যায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ লাখ টাকা। এই ভাতাগুলো কী ধরনের কার্যক্রমের জন্য ধরা হয়েছে, তা সুস্পষ্ট নয়। এসব ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমানো প্রয়োজন।
প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ২০ লাখ এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে ১৮ লাখ টাকা খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে। আসবাবপত্র ও কম্পিউটার ক্রয় বাবদও বড় অঙ্কের অর্থ চাওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন এসব ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর তাগিদ দিয়েছে।
ক্ষতিপূরণ ভাতায় ৩ কোটি ৩৫ লাখ এবং আউটসোর্সিংয়ে ১৭ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। নলকূপ স্থাপনে ১২ কোটি ও ভ্রমণে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এমনকি ডেটাবেইস সংরক্ষণের জন্যও ২০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিপিপি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাড়ির হায়ার চার্জ থাকা সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ধরা হয়েছে। কমিশন একে অযৌক্তিক মনে করছে। আসবাবপত্র ক্রয়ের ব্যয়ের যৌক্তিকতাও স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন অংশে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে এবং প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।
এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন- ২) মো. শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, প্রথমে এর বাজেট ছিল ৭৭৬ কোটি টাকা। এখান থেকে ব্যয় কমিয়ে ৭৭৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা গাড়ির হায়ার চার্জ কমিয়ে দিয়েছি। আরো কিছু ব্যয় আছে যেগুলো রিভিউ করে কিছুটা কমানো হয়েছে। এটা নিয়ে কয়েকটি মিটিং হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। আশা করছি, পিইসিতে উঠলে এ বছর কাজ শুরু হতে পারে।’
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) মো. এমদাদুল হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ‘গুচ্ছগ্রাম তৃতীয় ধাপের প্রকল্পের অগ্রিম ব্যয় নিয়ে কয়েকবার রিভিউ হয়েছে। আমরা ব্যয় কমিয়ে নিয়ে এসেছি। আশা করছি, এটা আগামী সপ্তাহে একনেকে উঠবে।’
অতিরিক্ত সচিব আরো বলেন, অনেকেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের সঙ্গে এটাকে মিলিয়ে ফেলে। এটা (আশ্রয়ণ প্রকল্প) প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটা প্রকল্প। আর গুচ্ছগ্রাম ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প।’