হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি ও ভারত থেকে আসা ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ধানের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। পাকা ধান এক রাতেই কোমর পানিতে ডুবে যাওয়ায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। শ্রম-ঘাম আর উচ্চব্যয়ে ফলানো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে কৃষকদের এখন মাথায় হাত।
বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এবং মৌলভীবাজারের হাওর এলাকায় পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানির নিচ থেকে ধান কাটতে গিয়ে কৃষকের চোখের পানি আর ঢল-বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে যাচ্ছে। কালবৈশাখীতেও অনেক এলাকায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
আবাহাওয়া অফিস-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির প্রভাব আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এতে কৃষকের দুশ্চিন্তা আরো বাড়ছে। কারণ, পাকা ধান শুকানোর সুযোগ না থাকায় পচনের ঝুঁকি বাড়বে। তাই বলা যায়, বোরোর ভরা মৌসুমে এমন আকস্মিক বন্যায় কৃষকরা অনেকটা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। এতে চলতি বছরের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
এদিকে, হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মাঠপর্যায়ে তদারকি ও সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির পরিচালক (সরেজমিন উইং) ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং কৃষকদের পাশে থাকার সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত কৃষকের ক্ষয়ক্ষতিকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছে সরকারও। সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে গতকাল বুধবার এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য টানা তিন মাস সরকারি সহায়তার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো কৃষক সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, গত কয়েক দিনে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, অন্তত চারটি নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে হাওর ও বিল এলাকার বিশাল ফসলি জমি ডুবে গেছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও আকস্মিক বন্যায় তা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক শেষ সম্বল হিসেবে ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কিন্তু হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, টানা বৃষ্টিতে কাটা ধান শুকানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদিত ধানের মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংকট, যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুপযোগী পরিবেশ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সুনামগঞ্জসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ধান কাটার জন্য যান্ত্রিক সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ড্রায়ার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কাঁচা ধান দ্রুত শুকানো যায় এবং ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রত্যেক উপজেলায় অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি জেলা থেকে ড্রায়ার মেশিন এনে সুনামগঞ্জে পাঠানো হচ্ছে।
বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনই দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় এবং পানি পুরোপুরি না নামায় প্রকৃত ক্ষতির চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আমার দেশকে বলেন, হাওরাঞ্চলে অনেক ধান ইতোমধ্যে পেকে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে যেখানে যেখানে ধান পেকেছে, সেখানে দ্রুত রিপার হারভেস্টার ব্যবহার করে ধান কেটে ঘরে তোলা জরুরি। এতে কৃষকদের ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, চলতি বছরের শুরুতে সার সংকট, পরে জ্বালানি সংকট এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধিÑসব মিলিয়ে কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এর ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এমন অবস্থায় কৃষকদের জন্য মূল্য সহায়তা (প্রাইস সাপোর্ট) দেওয়া সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে কৃষকরা লোকসানে পড়বেন এবং ভবিষ্যতে উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন।
সরকারের চলতি বছরের সংগ্রহ (প্রকিউরমেন্ট) নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত বছরের ধান-চালের যে দাম ছিল, এ বছরও একই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের লোকসান হবে।
উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, দেশে ধানের উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে তার মতে, এটি কমপক্ষে ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। হাওরাঞ্চলের এ ঘাটতি দেশের মোট ধান উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। কারণ, বোরো ধান থেকে দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ চাল আসে। এর বিপরীতে ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়।
আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, পশ্চিমা লঘুচাপের কারণে আগাম মৌসুমি বৃষ্টি হয়। চলমান এ বৃষ্টি আগামী ৪ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি আরো জানান, সব বিভাগেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি, বজ্রপাত, দমকা হাওয়া এবং শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। টানা বৃষ্টিতে কৃষির বড় ধরনের ক্ষতি হয় বলেও জানান এই আবহাওয়াবিদ।
কৃষকদের দাবি, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ করে পুনর্বাসন ও প্রণোদনা সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তারা বলছেন, আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরো কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
সার্বিকভাবে আকস্মিক বৃষ্টি ও বন্যায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চুয়াডাঙ্গায় বোরোর ব্যাপক ক্ষতি
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী ইউনিয়নে সম্প্রতি ঝড়-বৃষ্টিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে পাকা ধানগাছ মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। নিচু জমিতে কেটে রাখা ধান পানিতে ভাসছে। অনেকেই কেটে রাখা ধানের শীষের আগা কেটে নিয়ে যাচ্ছে।
উথলী গ্রামের ধানচাষি সাজ্জাদ হোসেন বলেন, মাঠের ধান পেকে কাটার উপযুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় কাটতে পারছি না। ধান বেশি পেকে গেলে ঝরে পড়ে, ফলন অনেক কম হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, এ বছর উপজেলায় সাত হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এখনো ধান কাটার কাজ পুরোদমে শুরু হয়নি। ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে কেটে ফেলার জন্য বলা হয়েছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকদের ধান কাটা ও মাড়াই করতে অসুবিধা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের হাওরে ডুবছে ধান
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে বোরো ধানের ক্ষেত। দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকা ও আধাপাকা ধান রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে কৃষকদের জন্য। তারা বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
কৃষকরা জানান, কয়েকদিন আগেও যে জমিতে ধান কাটার উৎসব চলছিল, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানি। শ্রমিক ও তেল সংকটে হারভেস্টার মেশিন চালাতে না পারায় ধান কাটার গতি কম ছিল। এরই মধ্যে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে কৃষক পরিবারগুলো। প্রায় বুক সমান পানিতে নেমে কঠোর পরিশ্রম করে তারা যতটুকু পারছেন ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
কৃষকরা জানান, তারা বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কিন্তু ভেজা ধান ঘরে তুলে শুকানোর উপায় নেই। রোদ না উঠলে ধান পচে যাবে। এ দুশ্চিন্তায় দিশাহারা তারা।
হাওরের কৃষকরা বলেন, ‘একদিকে বজ্রপাত, অন্যদিকে বৃষ্টি, আমাদের সব শেষ। তাও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পানিতে নেমে ধান কাটছি। না কাটলে আমাদের আর কিছুই থাকবে না, তাই যত কষ্টই হোক, এ ধানই আমাদের সারা বছরের ভরসা, তাই সব ঝুঁকি নিচ্ছি।
এছাড়া বৃষ্টির কারণে হাওরের মেঠোপথগুলো কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় কাটা ধান পরিবহন নিয়েও বিড়ম্বনায় পড়েছেন কৃষক। জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের ধানের খলা। একমাত্র ফসল বোরো ধান ঘরে তোলার আগেই এমন ভয়াবহ বিপর্যয়ে হাওরপাড়ে নেমে এসেছে চরম বিষাদ। ফসল হারিয়ে কাঁদছে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীর হাওরপাড়ের কৃষক। ধান কাটা উৎসবের বদলে হাওরে এখন বিষণ্ণতা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, কৃষি কর্মকর্তারা হাওর পরিদর্শন করছেন। তিনি জানান, এবার জেলায় এক লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। বুধবার দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন হাওরের দুই হাজার ৩১ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জে ডুবছে সোনার ফসল
সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বোরো ফসল। হাওরের পানিতে ভাসছে শ্রমে ঘামে ফলানো সোনার ফসল।
হাওরে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ সেমি। সুরমা নদীতে পানি বিপৎসীমার ১৬৯ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কৃষকরা জানান, হাওরে এখন পর্যন্ত ৩০ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে। হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা যাচ্ছে না। শ্রমিক সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। কাটা ধান আনার রাস্তা নেই। কাদাজল মাড়িয়ে ধান পরিবহন সম্ভব হচ্ছে না। ধান ক্ষেতে দাঁড়িয়ে কৃষক এসবের চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
জবান আলী নামে এক কৃষক বলেন, কিছু ধান কেটে মাড়াই শেষে খলাতেই রেখেছিলাম। সকালে এসে দেখি ধানে পচন ধরে গন্ধ বের হচ্ছে। পানি না কমলে হাওর জলেই ধান ডুবে নষ্ট হয়ে যাবে।
কৃষক জুলহাস মিয়া জানান, হাওর ও নদীর পানি সমান হওয়ায় জমি ডুবে গেছে। হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না।
কৃষক জিয়াউর রহমান জানান, হাওরে পানিতে ধান ডুবে গেছে। হাওরে শ্রমিক মিলছে না। যে জমিটুকু ভাসমান আছে বজ্রপাত ও বৃষ্টির কারণে কাটা যাচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষকদের পাকা ধান দ্রুত কাটতে পরামর্শ দিয়েছি।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, বৃষ্টি আরো বাড়বে। পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে ফসলরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। স্বাভাবিক কারণেই ফসলের ক্ষতি হতে পারে।
মৌলভীবাজারে তলিয়ে গেছে ৮৯৭ হেক্টর জমির ধান
মৌলভীবাজারে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় এবং ভারত থেকে আসা ঢলের পানিতে বাড়ছে মনু, ধলাই, কুশিয়ারা নদীর পানি। জুড়ি নদীর পানি বিপৎসীমার ১১৩ সেন্টিমিটার (সেমি) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বোরো আবাদের ৮৯৭ হেক্টরের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, নষ্ট হয়েছে আউশ ধানের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি আবাদ।
গত মঙ্গলবার রাত বারোটার পর থেকে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। ওইদিন সন্ধ্যায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে জুড়ি নদীর পানি। বর্তমানে ১১৫ সেমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন ওয়ালিদ জানান, মনু নদীর বেড়িবাঁধের তিনটি জায়গায় এবং ধলাই নদীর দুটি জায়গায় বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এগুলোতে এখনো কাজ শুরু করা যায়নি। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরো জানান, মুষলধারে বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় ছোট নদী বা ছড়ার বাঁধ ভেঙে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়িসহ ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় এবং উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর প্রভাবে আগামী তিনদিনের মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন জানান, ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও অত্যধিক বৃষ্টিপাতে জেলায় ৮৯৭ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে সদরে ৪৭০ হেক্টর, রাজনগরে ১৪০ হেক্টর, কমলগঞ্জে ৭০, শ্রীমঙ্গলে ২১৭ হেক্টর রয়েছে।
এদিকে কালবৈশাখীতে জেলায় ৮৫৫টি কাঁচা ও আধাপাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কমলগঞ্জে ১৭৭টি, শ্রীমঙ্গলে ২৫০, কুলাউড়ায় ৩৩০ ও রাজনগরে ৯৮টি ঘর রয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ১০০ টন জিআর চাল এবং নগদ তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
নবীনগরে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের ওপর দিয়ে গত মঙ্গলবার সকালে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন আমার দেশকে বলেন, কালবৈশাখীতে ১৫১ হেক্টর জমির বোরো ধান, ২৪ হেক্টর জমির সবজি, ৬ হেক্টর ফলবাগান, ২০ হেক্টর জমির তিল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে অধিকাংশ জমির পাকা ও আধা পাকা ধান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
আলীয়াবাদ গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানান, ধান নুয়ে পড়ায় কাটা-মাড়াইয়ের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এছাড়া বৃষ্টি হলে ধান পচে যাওয়ার এবং ভেজা ধানের দাম কম পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দিনাজপুরে উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
দিনাজপুরে কালবৈশাখীতে ও শিলাবৃষ্টিতে ধান, ভুট্টা, আম, লিচু, টমেটো, মরিচসহ উঠতি বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। গাছপালা উপড়ে পড়েছে।
জানা গেছে, দুদিনের ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে মুরারিপুর, দেবীপুর গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষেতের আধাপাকা ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। চিরিরবন্দরের বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ে ধান, ভুট্টা, লিচু, টমেটোসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভুট্টার গাছ মাটিতে নুয়ে পড়েছে। টমেটোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন।
ঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে বীরগঞ্জে। কালবৈশাখীতে শত শত একর ক্ষেতের ভুট্টা মাটিতে নুয়ে পড়েছে। দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। একই সঙ্গে বোরো ধানেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া বিরল উপজেলায় আকস্মিক ঝড়ের তাণ্ডবে গাছপালা উপড়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। ঝড়ে ধান, ভুট্টা, পাট, মরিচ, আম ও লিচুসহ অন্যান্য ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বরিশালে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি
বরিশালে টানা বর্ষণ ও ঝোড়ো হওয়ায় কৃষকের ক্ষেতে পাকা বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে জেলাজুড়ে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে দুদিনের ভারি বর্ষণে কৃষকের ক্ষেতে কেটে রাখা ধানগুলো তলিয়ে গেছে। দমকা হাওয়ায় অধিকাংশ উপজেলার পাকা বোরো ধান নুয়ে পানির সঙ্গে মিশে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে ফসল ঘরে তুলতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক।
এদিকে টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় কী পরিমাণ ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না জেলা কৃষি বিভাগ। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তারা।
গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সমুদ্র বন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত এবং নদী বন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আগামী তিনদিন আবহাওয়া এমন থাকবে বলে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে।
কুমিল্লায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
কালবৈশাখীর তাণ্ডবে কুমিল্লায় প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে জেলার ১৭৩৩ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া ৫৫০ হেক্টর ভুট্টা, ২৩৫ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা এবং ৩৬৪ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে। লাকসাম, দাউদকান্দি, নাঙ্গলকোট, দেবিদ্বার ও মুরাদনগরে ফসলের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি ।
সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুনায়েদ কবির খান আমার দেশকে বলেন, উপজেলায় ১০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধান গাছগুলো মাটির সঙ্গে শুয়ে গেছে।
অর্ধশতাধিক গ্রাম বিদ্যুৎহীন
কালবৈশাখীর তাণ্ডবে কুমিল্লা ১৭ উপজেলাতেই বৈদ্যুতিক সংযোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলাগুলো। ঝড়ো বাতাসে খুঁটি উপড়ে, ট্রান্সফরমার ও মিটার নষ্ট হয়ে গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হচ্ছে। অর্ধশতাধিক গ্রাম বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। পানির নিচে তলিয়ে আছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ।
গত মঙ্গলবার কালবৈশাখীর সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অনেক কেন্দ্রে এসএসসি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে অন্ধকারে কিংবা চার্জার লাইট ও মোমবাতি জ্বালিয়ে।
জানা গেছে, দুদিনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর অধীনে ৭১টি খুঁটি ভেঙেছে। ১০২৫টি স্পটে বৈদ্যুতিক সংযোগের ওপর গাছ পড়েছে। ৫৫০টি মিটার ভেঙেছে এবং ৭৩৮টি স্পটে তার ছিঁড়েছে।
এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এলাকায়ও বৈদ্যুতিক সংযোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার সকালে কালবৈশাখীতে প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকে এসব এলাকার গ্রাহক।
সাভারে গোলাপ গ্রামে ব্যাপক ক্ষতি
সাভারে কালবৈশাখী ও গত তিনদিনের ঝড়বৃষ্টিতে গোলাপ বাগান ও শাক সবজির বাগানে বেশ ক্ষতি হয়েছে। বিরুলিয়া ইউনিয়নের শ্যামপুর, সাদুল্লাহপুর, মৈস্তাপাড়া, বাগ্নিবাড়ি, বাটুলিয়া, কালিয়াকৈর ও কমলাপুর গ্রামের গোলাপ বাগানের গাছ থেকে ফুল ঝরে পড়েছে। বেশকিছু বাগানের ফুলগাছ দমকা হাওয়ায় মাটিতে নুয়ে পড়েছে।
শ্যামপুরের চাষি আলাউদ্দিন জানান, প্রচণ্ড বাতাসে তার তিন বিঘা জমির গোলাপ বাগানের বেশ ক্ষতি হয়েছে। এ রকম অনেকের গোলাপ বাগান ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে।
বনগাঁ ইউনিয়নের সাদাপুর গ্রামের চাষি গোলাম হোসেন জানান, তার পুঁই শাক ও লাউ চাষের জাঙলা বাতাসে পড়ে বেশ ক্ষতি হয়েছে। সাভার উপজেলা কৃষি অফিস কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]