দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ শূন্য রয়েছে দুই মাসের বেশি সময় ধরে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদ শূন্য থাকায় কাজের গতি কমে গেছে। গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে এক হাজার ২৫০টিরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে, যার বেশিরভাগই দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আয়ের। এছাড়া অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) অভিযোগও রয়েছে। চেয়ারম্যান না থাকায় অভিযোগগুলো তদন্ত করতে পারছে না কমিশন। পাশাপাশি নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া যাচ্ছে না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পাঁচ বছরের জন্য দুদকে নিয়োগ পান চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ। প্রায় এক বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর চলতি বছরের ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন তারা। এরপর দুই মাস চলে গেলেও নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ হয়নি। এমনকি চেয়ারম্যান নিয়োগের জন্য কোনো সার্চ কমিটিও গঠন করা হয়নি।
এ বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্ত।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আমার দেশকে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সরকার তার অঙ্গীকার পালন করবে। বিএনপির ৩১ দফার মধ্যে দুদককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জনগণ সে কথা বিশ্বাস করে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এখন পর্যন্ত দুদকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দুদক সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দুদকের পূর্ণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে একটি ‘স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে একমত হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে বিধানটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুদকে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম জোরদার হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগের বিপরীতে মামলা ও চার্জশিটে প্রায় তিন হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দুদকের আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও এমপিরা রয়েছেন। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয় আদালত। তবে নতুন সরকার আসার পর কমিশনের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কোনো কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তিন মাস আগে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করলেও এখনো নতুন কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ ‘সার্চ কমিটি’ই গঠন করা হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন, ২০০৪-এর ১০ ও ১১ ধারায় চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের পদত্যাগ, অপসারণ এবং সাময়িক শূন্যতা পূরণের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের ১০(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো কমিশনার রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের লিখিত নোটিস দিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারবেন। ওই নোটিসের একটি অনুলিপি চেয়ারম্যানের কাছে অবগতির জন্য পাঠাতে হবে। ১০(২) উপধারায় বলা হয়েছে, পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কমিশনারকে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখার অনুরোধ করতে পারবেন। অপসারণ-সংক্রান্ত ১০(৩) উপধারায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেভাবে এবং যেসব কারণে অপসারিত হতে পারেন, একই ধরনের কারণ ও প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না। চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে সাময়িক শূন্যতা পূরণ নিয়ে ১১ ধারায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো কমিশনার মৃত্যুবরণ করলে, পদত্যাগ করলে বা অপসারিত হলে সে পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যক্তিকে নতুনভাবে নিয়োগ দেবেন।
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বা সমপর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সার্চ কমিটি গঠন করে থাকে। এ কমিটির মূল দায়িত্ব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে সহায়তা করা। সার্চ কমিটি সংশ্লিষ্ট পদগুলোর জন্য যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করে একটি পদের বিপরীতে সাধারণত দুজন বা তার অধিক নামের তালিকা তৈরি করে। এরপর সে তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা থেকে একজনের নাম চূড়ান্ত করেন। দুদক আইন অনুযায়ী, অনুসন্ধান, মামলা, গ্রেপ্তার, সম্পদ ক্রোক, অবরুদ্ধকরণ এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল কমিশনের হাতে থাকে। তবে বর্তমানে দুদকে চেয়ারম্যান না থাকায় কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুদকে ১৩ হাজার ৮৭৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে দুই হাজার ৫৩৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। এ বছর সর্বোচ্চ ৫৯৪টি মামলা এবং ৪১৩টি মামলার চার্জশিট দাখিল ও ৪৩২ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস জারি করা হয় দুদক থেকে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত দুদকে চেয়ারম্যান নিয়োগ হলে ব্যাপকহারে বদলির ঘটনা ঘটে থাকে। বদলির আতঙ্ক থাকায় অনেক কর্মকর্তা আগ্রহ নিয়ে কাজ করছেন না। ফলে অনেক কাজ জমে আছে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হলে কাজের গতি বাড়বে বলে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন।