হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

জ্বালানি নিয়ে সারা দেশে তুলকালাম, হাহাকার

এম এ নোমান

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশেও আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে সবাইকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সীমিত মজুতের কথা উল্লেখ করে যানবাহন মালিকদের রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সংগ্রহের নির্দেশনা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে পেট্রোলপাম্পগুলোয় চলছে যানবাহন চালক ও মালিকদের তুলকালাম, হাহাকার।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, পাম্পগুলোর দুদিকে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে গাড়ির লাইন। কোথাও কোথাও আতঙ্কে মালিকরা পাম্প বন্ধ করে দিয়েছেন। এ পরিস্থিতির জন্য গ্রাহকদের অতিমাত্রার বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখছেন পাম্প মালিকরা। তারা জানান, জ্বালানি তেলের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানোর পর গত দুদিনে চাহিদা বেড়েছে ১০ গুণের মতো। কোথাও কোথাও তার চেয়েও বেশি। সবাই ট্যাংক ফুল করে তেল নিতে চায়। না দিলে হুমকি-ধমকিও দিচ্ছে। অনেক স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে।

দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের মজুত উল্লেখ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একজন কর্মকর্তা জানান, দেশে এ মুহূর্তে ১০ দিনের ডিজেল, ১৭ থেকে ১৮ দিনের অকটেন, ১৩ দিনের পেট্রোল, ৯০ দিনের ফার্নেস ওয়েল ৫২ দিনের জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে। এছাড়া ৩০ হাজার ও ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে আরো দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে এসেছে। আরো কয়েকটি জাহাজ পথে রয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও সরকার বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পবিত্র রমজান ও সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার এ খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

গ্যাসের পরিস্থিতি নিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক আমার দেশকে বলেন, চলতি মার্চে আমাদের গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করছি। এপ্রিলের পরিকল্পনা আমরা করছি। ইতোমধ্যেই সরকার এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে।

পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে আমরা দুই কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করি। এখন একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে হচ্ছে দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। এখানে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে আমাদের। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভোরের কার্গোটি ১৫ থেকে ১৬ মার্চ এবং অপর প্রতিষ্ঠান ভিটলের কার্গোটি ১৮ থেকে ১৯ মার্চ দেশে দেশে আসবে।

তেলের জন্য পাম্পে হুড়োহুড়ি, হাহাকার

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার ঘোষণা দেওয়া হলেও ক্রেতারা পাম্পগুলোতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল পাচ্ছে না। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অতিরিক্ত পরিমাণে জ্বালানি তেল সংগ্রহের প্রবণতাকে দায়ী করছেন পাম্প মালিকরা। তারা বলেন, গ্রাহকদের চাহিদা কম থাকায় গত শুক্রবার ও শনিবার ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকে। এটি অনেক পুরোনো সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই দুদিন জ্বালানি তেলের যে চাহিদা তা বিশ্বাস করার মতো নয়। কোথাও স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি।

পাম্পের দুই পাশে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত লাইনকে গ্রাহকদের অতিমাত্রার পাগলামি বলে মনে করেন পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাজ্জাদ করিম কাবুল। আমার দেশকে তিনি বলেন, আজব লাগছে আমার কাছেই। আমি এ পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। মানুষ এতটা পাগল হলো কেন বুঝতে পারছি না। সবার মধ্যেই একটি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে কেয়ামত খুব কাছেই চলে এসেছে, জ্বালানি তেল না পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

পেট্রোলপাম্প মালিকদের এ নেতা আরো বলেন, সারা দেশ থেকে যে সংবাদ পাচ্ছি তা সুখকর নয়। অনেক জায়গায় আমাদের পাম্প মালিকদের ওপর হামলা হয়েছে। কেউ কেউ নাজেহাল হয়েছে। সবাই পাম্পে এসে ক্ষমতা দেখাচ্ছে। বহু পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তার কারণে। তবে জ্বালানির কোনো সংকট নেই বলে জানান তিনি।

সাজ্জাদ করিম কাবুল বলেন, সরকার মোটরসাইকেলের জন্য দুই লিটার তেলের রেশনিং করে দিয়েছে। অথচ সবাই এসে ট্যাংক ফুল করে দিতে বলছে। নিষেধ করলেই হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। কেউ কেউ এলাকার নেতাদের দিয়ে ফোন করিয়ে ট্যাংক ফুল করে দিতে বলছে। গাড়ির মালিকদের আচরণ আরো খারাপ বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রীর বৈঠক

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ও দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি মজুত ও সরবরাহের সবশেষ অবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জ্বালানি মন্ত্রী। বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানি পরিস্থিতি, এলএনজি ও এলপিজি আমদানির সার্বিক চিত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করা হয়। এ সময় জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প দেশ খোঁজার নির্দেশনা দেন তিনি।

শনিবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, অনেকেই আশঙ্কা থেকে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এতে সবাই আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এমন আতঙ্কের কোনো কারণ নেই বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, বর্তমান মজুত সন্তোষজনক। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সংকট এড়াতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনাও প্রস্তুত করে রেখেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে সেসব বিকল্প উৎস ব্যবহার করা হবে।

মন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেছেন।

এ সময় তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান। মন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে মিডিয়ার কাছে আমার অনুরোধ থাকবে—আপনারা জনগণকে এই বার্তাটা দিন যে তাড়াহুড়া করে তেল কেনার কোনো দরকার নেই। আমাদের কাছে মজুত আছে, আমরা নিয়মিত পেট্রোলপাম্পে তেল সরবরাহ করছি। মানুষ তেল নিতে গেলে তেল পাবে। সারা রাত লাইন দিয়ে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।

কিছু পেট্রোলপাম্পে তেল না পাওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল সরবরাহ করছে। কোনো পাম্প যদি দ্রুত সব তেল বিক্রি করে ফেলে, তাহলে তাদের পরবর্তী সরবরাহ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

তিনি বলেন, আমরা নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল দিচ্ছি। কোনো পাম্প যদি দ্রুত বিক্রি করে ফেলে, তাহলে তো আর সঙ্গে সঙ্গে তেল পাবে না। পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমরা বিষয়টি মনিটর করছি। কোনো পাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি লাভের আশায় তেল বিক্রি বন্ধ রাখছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে দেখা হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার মোবাইল কোর্ট পরিচালনারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রী বলেন, আমাদের কন্ট্রোলিং ব্যবস্থা আছে। কাল থেকেই আমরা মোবাইল কোর্ট নামিয়ে দেব। সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে দুই লিটার করে তেল দেওয়ার রেশনিং বাড়ানো হবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আপাতত তা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে কাঁচামালের সংকট নেই

কাঁচামালের (অপরিশোধিত তেল) কোনো সংকটে নেই দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কাছে এখনো অপরিশোধিত তেলের যে মজুত রয়েছে তা দিয়ে আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। এখানে প্রতিদিন চার হাজার টন করে তেল পরিশোধন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আসে। এখন তা পরিশোধন করা হচ্ছে। এখানে অকটেন ছাড়া ডিজেল, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল, এলপিজি, জেট ফুয়েল ও বিটুমিন এ কারখানায় উৎপাদন হয়। তবে, যখন যে তেলের চাহিদা বেশি থাকে তখন সে তেল বেশি উৎপাদন করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য আমদানির এক লাখ টন তেলভর্তি জাহাজ অপেক্ষা করছে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে। ২ মার্চ এটি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে জাহাজটি আটকা পড়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে জাহাজটি দেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। এছাড়া আরব আমিরাত থেকে আরো এক লাখ অপরিশোধিত তেল নিয়ে ২১ মার্চ দেশের উদ্দেশে আরেকটি জাহাজ রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। জাহাজটি নির্দিষ্ট সময়ে তেল নিয়ে দেশে পৌঁছাবে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা আশা করেন। আরব আমিরাত থেকে এ জাহাজটি বাংলাদেশে পৌঁছাতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ দিন সময় লাগতে পারে।

এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালির বিপজ্জনক নৌপথ পাড়ি দিয়ে কাতার থেকে এক লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া ‘আল গালায়েল’ ও ‘লুসাইল’ নামে আরো দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে ‘লিবারেল’ নামে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে আটকা পড়ে আছে বলে জানান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা জানান, ওমানের সোহার বন্দর থেকে ‘সেভান’ ও ‘জি ওয়াইএমএম’ নামের আরো দুটি জাহাজে করে প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি আসছে। এ জাহাজ দুটি নিরাপদ পথে এখন বাংলাদেশ অভিমুখে রয়েছে।

নতুন নামে ফেনসিডিল ঢোকাচ্ছে ভারতীয় মাদক কারবারিরা

ছুটির দিনে ক্রেতামুখর মার্কেট, শপিংমল

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান

জ্বালানি তেল সংকটের আতঙ্কে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন

ইরান ধ্বংসের পর ট্রাম্পের নিশানায় কিউবা

স্পিকার পদে আলোচনায় মঈন খান, ডেপুটিতে পার্থ

আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী নির্যাতন

ড. ইউনূসের বিদায়ে স্বস্তিতে দিল্লি

আসামি করা হচ্ছে হাসিনাসহ আওয়ামী মন্ত্রী-এমপিদের

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এলাকায় সরব জামায়াতের এমপিরা