দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়ার পেছনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, ২০২৪ সালে জাতীয় টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের কারণে নিয়মিত টিকাদানে ভাটা এবং গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বাতিল—এ তিনটি কারণ বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এদিকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশে হামের টিকা সাধারণত দুভাবে দেওয়া হয়। প্রথমটি হলো নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় এবং দ্বিতীয়টি হলো জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে। নিয়মিত কর্মসূচিতে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টিকা কেন্দ্রে ৯ মাস বয়সি শিশুকে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে জাতীয় ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এ দুটি পদ্ধতিতেই ব্যর্থ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নির্ধারিত জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালেও দেওয়া হয়নি। অথচ দেশে চার বছর পরপর এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ এমন ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, তার আগে ২০১৬ সালে। কিন্তু ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালে এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়।
এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমেও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। এতে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু টিকা পেয়েছে, যেখানে কমপক্ষে ৯২ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে না পারলে হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না বলে জানান অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতের ১৭টি ওপি বাতিল করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
ব্যর্থতার কারণ জানতে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুর জাহান বেগমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক পেডিয়াট্রিক সার্জন অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলার আশ্বাস দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সাড়া দেননি। পরে প্রতিক্রিয়া জানতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়) অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বিষয়টি শোনার পর ঘণ্টা তিনেক পরে প্রতিক্রিয়া দেবেন বলে আমার দেশকে জানান। তিনি বলেন, এখন কথা বললে তিন সরকারের মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝি হবে। পরে তিন ঘণ্টা পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ব্যর্থতার বিষয়ে বলতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান আমার দেশকে বলেন, চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশব্যাপী কয়েক দিনের মধ্যে সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। এটি ২০২০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, হামের এই পরিস্থিতি হওয়ার পেছনে ২০২৪ সালে ক্যাম্পেইন না করা অন্যতম কারণ। কিন্তু এছাড়া আরো দুটি কারণ রয়েছে। যার প্রথমটি হলো স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্দোলন করার কারণে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু টিকে পেয়েছে, বাকিরা টিকা পায়নি। সাধারণত ৯২ শতাংশ শিশু টিকা না পেলে এ ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো ১৭টি ওপি বাতিল করা। অন্তর্বর্তী সরকার ওপিগুলো বাতিল করায় এই পরিস্থিতির শিকার হতে হলো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ দিনে (১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তিন হাজার ৭০৯ শিশু। এর মধ্যে ৫৮৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং অন্তত ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ২৭ শিশুর। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে চার শিশুর। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি
‘হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে টিকা ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতায় টিকার অভাবে যদি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে এতে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান বক্তারা। রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে গতকাল বৃহস্পতিবার এ গোলটেবিল বৈঠক হয়।
নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেলের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যমকর্মী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে উপস্থিত ছিলেন ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক রুবীনা ইয়াসমিন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. হানিফ, ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম, সাংবাদিক আব্দুল হাই সিদ্দিক প্রমুখ।
টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করে এক বক্তা দাবি করেন, ক্রয়-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে যদি হামের প্রাদুর্ভাব এত বৃদ্ধি পায় এবং তা যদি শিশু মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে। তবে এর সঙ্গে জড়িতদের তদন্ত সাপেক্ষে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে অতিথিরা টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে যেন জনদুর্ভোগ না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।