হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

কওমি অঙ্গনে টার্গেট মামুনুল হক

রকীবুল হক

দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচিত নাম মাওলানা মামুনুল হক। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে যুক্ত হয়ে গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং বর্তমান বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকায় আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এ আমির। হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি কওমি অঙ্গনের একাংশ থেকে যখন জামায়াতবিরোধী তৎপরতা জোরদার হচ্ছে, তখন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে একমঞ্চে মামুনুল হকের অবস্থান নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।

শুধু জোটগত রাজনীতিই নয়, কওমি অনেক আলেমের জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া বা সেদিকে ঝুঁকে পড়া নিয়েও বেশ উদ্বিগ্ন তারা। এ পরিস্থিতির জন্য মামুনুল হককে তার বর্তমান অবস্থান থেকে ফেরাতেই টার্গেট করে নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। সম্প্রতি ‘ফেতনায়ে মামুনিয়া ও মাওলানা আব্দুল হক আজাদের গর্জন’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশকে ঘিরে মামুনুল হকের পক্ষে-বিপক্ষে এ বিতর্ক আরো বেড়েছে।

একদিকে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য থেকে মামুনুল হককে সরিয়ে আনার তৎপরতা, অন্যদিকে কওমিপন্থি সাতটি দল নিয়ে পৃথক ঐক্য গঠনের উদ্যোগ—দুই মিলে অস্থিরতা বাড়ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পাশাপাশি ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও নতুন জোটের প্রস্তাবিত শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে গঠিতব্য সাতদলের ঐক্যের খসড়া অনুযায়ী, এতে যুক্ত হলে অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকা যাবে না।

তবে সংশ্লিষ্ট দুই দলের মত হলো, নতুন ঐক্য ধর্মীয় বিষয়ে সমন্বয়ের ভিত্তিতে হতে পারে; রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার থাকতে হবে নিজ নিজ দলের। আগামী ২২ অক্টোবরের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত কাঠামোয় ঐকমত্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এক্ষেত্রে শর্ত শিথিল অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে আগ্রহীদের নিয়ে ঐক্যের সিদ্ধান্ত হতে পারে।

হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ কওমি ঐক্য ও মামুনুল হক ইস্যু প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, মামুনুল হকবিরোধী প্রচারণা আরো প্রকট হতে পারে। কারণ জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের দূরত্ব ধর্মীয়, রাজনৈতিক নয়।

তিনি বলেন, মহব্বত আছে বলেই মামুনুল হক জামায়াতের জোটে আছেন, না হলে তো থাকতেন না।

মামুনুল হকের জামায়াতের সঙ্গে থাকা কওমি অঙ্গনের ক্ষতি করছে দাবি করে হেফাজতের এ নেতা বলেন, তাকে অনুসরণ করেই অনেক তরুণ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাতদলের ঐক্য প্রসঙ্গে বশির উল্লাহ জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে উপস্থাপিত খসড়া নীতিমালা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলো নিজ নিজ পর্যায়ে আলোচনা করছে। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তার মতে, ঐক্যটি স্থায়ী রাজনৈতিক জোট হিসেবে গড়ে উঠলে এর শরিকদের বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো জোটে থাকার সুযোগ থাকবে না। তবে এ শর্তে সবাই একমত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। হেফাজত নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থানেই থাকবে বলেও জানান তিনি।

বই ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

সম্প্রতি কওমি ঘরানার আলেম, লেখক ও প্রকাশক শাকের হোসাইন শিবলির সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ফেতনায়ে মামুনিয়া ও মাওলানা আব্দুল হক আজাদের গর্জন’ বইটি নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বইটিতে মামুনুল হকের জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

বইটি প্রকাশের পেছনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত আন্দোলনসহ মামুনুল হকবিরোধী বিভিন্ন মহলের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে কওমি অঙ্গনের কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে লেখক ও সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এ প্রসঙ্গে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, তারা দেশের স্বার্থে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করেছেন, আকিদার প্রশ্নে নয়। ফলে জামায়াতের আকিদা নিয়ে দেওয়া কোনো ফতোয়া তাদের ওপর বর্তায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বইটি প্রকাশের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, তাদের দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়া এবং নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। আবার সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রশ্রয়েও এমন প্রচারণা চালানো হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে আমরা মজলুম ছিলাম, এখন স্বজাতি দ্বারা অপপ্রচারের শিকার হচ্ছি। তার দাবি, কোনো অপপ্রচারেই তাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না।

এদিকে মামুনুল হকের বিরুদ্ধে বই লেখার কারণ ও বিষয় সম্পর্কে লেখক শাকের হোসাইন শিবলি বলেন, ব্যক্তি মামুনুল হকের সঙ্গে তার কোনো বিদ্বেষ নেই। তবে মামুনুল হক যেভাবে জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন, তা বন্ধ করতেই তিনি বইটি লিখেছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে লেখা বইটির কাজ প্রায় দেড় বছর আগে শুরু করেছিলেন বলেও জানান তিনি।

বইটির শিরোনামে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হক আজাদের নাম থাকায় দলটির সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে দলটির সহকারী মহাসচিব ও প্রচার বিভাগীয় প্রধান শেখ ফজলুল করীম মারুফ ফেসবুক পোস্টে জানান, বইয়ের সঙ্গে দলগতভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এবং ব্যক্তিগতভাবে মাওলানা আব্দুল হক আজাদ বা অন্য কারো কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের নীতিতে দলটি বিশ্বাস করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে ৪২ পৃষ্ঠার বইটির প্রচারে ‘ঈমান আকিদা সংরক্ষণ কমিটির’ নাম ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজি খেলাফত আন্দোলনের আমির হওয়ায় দলটি নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তবে বইটির সঙ্গে তাদেরও কোনো সম্পর্ক নেই জানিয়ে হাবিবুল্লাহ মিয়াজী আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে লেখকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তিনিও একই নামে সংগঠন পরিচালনা করেন। তবে বইটির সঙ্গে খেলাফত আন্দোলন বা তাদের সংশ্লিষ্ট ঈমান আকিদা সংরক্ষণ কমিটির কোনো সম্পর্ক নেই জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আমাদের অবস্থান হলো, কোনো আলেমের সমালোচনা আমরা করব না। এ বইটি আমরা সমর্থন করি না। তবে যারা সাহাবিদের সমালোচনা করেন, তাদের সঙ্গে থাকার কোনো যুক্তি নেই।

সমালোচনায় আলেমদের একাংশ

এদিকে নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত বই সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক অনুষ্ঠানে মামুনুল হক বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে তো এখন বই চলে আসছে। তবে এসব লিখে আমাদের দমিয়ে রাখা যাবে না। আমরা আদর্শের কথা বলেই যাব। একটা নয়, হাজারটা বই লিখলেও আমি হক কথা বলেই যাব।

বইটির সমালোচনা করে খেলাফত মজলিস ও হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী ফেসবুক পোস্টে লেখেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলে তা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। মামুনুল হককে ‘ফেতনার উৎস’ হিসেবে তুলে ধরে বই প্রকাশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা নিজেদেরই ক্ষতি করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা ওয়ালী উল্লাহ আরমানও বইটির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, নীতি-আদর্শ বা কর্মপন্থার পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরনের উদ্যোগ নতুন বিরোধের পথ খুলে দিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাতদলের ঐক্যে জটিলতা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইসলামি দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার উদ্যোগ থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের সূচনা হয়। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাশাপাশি কয়েকটি সমমনা দল এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলেও শেষ মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যায়। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে বর্তমানে সংসদের বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিয়েও আসন পায়নি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের বিভক্তিতে বেশ অস্বস্তিতে পড়েন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিভক্তি কাটাতে গত ১৬ জুলাই হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে সাতটি ইসলামী দলের নেতাদের নিয়ে ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে খসড়া নীতিমালার শর্ত এবং রাজনৈতিক জোটে থাকার প্রশ্নে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। মূলত, এ দুটি দলকে জামায়াত জোট থেকে বের করতেই কওমিপন্থি দলগুলোর ঐক্য গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

অভিযোগ দাখিলের আট মাসেও শুরু হয়নি বিচার

চায়ের আমন্ত্রণের পর সদস্যদের পদত্যাগ

সংখ্যালঘুদের ধর্মপালনের অধিকারের বিপরীত চিত্র

সুউচ্চ প্রাচীরে বন্ধ হচ্ছে সাধারণের প্রবেশ

বিপুল বকেয়া ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ধুঁকছে টেলিটক

চিকিৎসার মানচিত্রে অন্ধকারে উপজেলা

কৃষির বি-স্ট্রং প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি

টানা ফ্লাইট বাতিলে আর্থিক চাপে এভিয়েশন খাত

উৎপাদনে অগ্রগতি, তবু খাদ্য নিরাপত্তায় সংকট

খবর নেই বিনিয়োগের