এক সময় রাজধানী ঢাকায় এলাকাভিত্তিক কিছু ব্যক্তির নাম শুনলেই মানুষ আঁতকে উঠত। দিন-দুপুরে চাঁদা চেয়ে চিরকুট পাঠাত তারা। পুলিশকে জানালে হয়তো তাদের জীবনই চলে যাবে। এ কারণে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানাত না। পুলিশের অভিযানে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ড। চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীরা আবার খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে চিন্তিত পুলিশ প্রশাসন।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের পর থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত মঙ্গলবার রাতে নিউ মার্কেটে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন অপর গ্রুপের হাতে নিহত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই অপরাধ সাম্রাজ্য। তারা প্রকাশ্যে খুনোখুনিতে লিপ্ত হওয়ায় জনমনে ভীতি সঞ্চার হচ্ছে। এদের অবৈধ অস্ত্রের উৎস বন্ধ করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, পুলিশের নজরদারির ফলে দীর্ঘদিন ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে ছিল। কেউ কেউ কারাগারেও ছিল। তবে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারেক সাঈদ মামুন নামে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় একদল সন্ত্রাসী। ওই গুলি লাগে কাছে থাকা মোটরসাইকেল আরোহী আইনজীবী ভুবন চন্দ্রের মাথায়। সে সময় থেকে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে আন্ডারওয়ার্ল্ড।
২০২৪ সালের ২৫ মে মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় সাধন নামে এক ডিশ ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও লভ্যাংশ নিয়ে বিরোধের জেরে বিদেশে অবস্থানরত চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। ঢাকার বাড্ডা এলাকার ডিশ, ইন্টারনেট ও ঝুট ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং জমি দখলের মতো অপরাধগুলো পুলিশের খাতায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী রবিন ও ডালিম মালয়েশিয়ায় বসেই পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টারে দলবল নিয়ে মহড়া দেয় শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। এ নিয়ে সেখানকার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারে সাদেক খান আড়তের সামনে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। ওই খুনের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল জড়িত। প্রায় দুই যুগ পর জামিনে বের হওয়া পিচ্চি হেলালের বিরুদ্ধে এ ঘটনায় ফের হত্যা মামলা হয়। গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে পুলিশের এক সময়ের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
সূত্র জানায়, রাজধানীতে এক সময় চাঁদাবাজি আর আধিপত্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার গ্রুপের। দিন-দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে চলত এসব সন্ত্রাসীর অস্ত্রের মহড়া। এদের মধ্যে খিলগাঁওয়ের জিসান, মিরপুরের শাহদাত, লিটু, কারওয়ান বাজারের আশিক, কল্যাণপুরের প্রকাশ, যাত্রাবাড়ীর ইতালি নাসির, মগবাজারের রনি, শাহ আলী এলাকার গাজী সুমন, আদাবরের নবী, মোহাম্মদপুরের কালা মনির উল্লেখ্যযোগ্য।
সূত্র জানায়, সবশেষ আন্ডারওয়ার্ল্ডের খুনোখুনিতে নিহত হন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। ২০০১ সালে পুলিশ যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে টিটনের নামও ছিল। তার ভগ্নিপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। তারা দুজনই মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসীচক্র হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।
পুলিশ জানায়, টিটন ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে ঢাকার অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন এবং ধীরে ধীরে অপরাধ জগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। টিটন অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
এদিকে, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে খোয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি ভাবাচ্ছে পুলিশকে। কারণ, পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েও খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। অপরাধ বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যেতে পারে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধিকাংশ সন্ত্রাসী আত্মগোপনে বা বিদেশে পলাতক রয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ চেষ্টা করছে।