হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

আওয়ামী আমলের চুক্তিতে শত শত কোটি টাকা গচ্চার শঙ্কা

আবু সুফিয়ান

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন অনিয়ম, নীতিমালার লঙ্ঘন ও পদ্ধতিগত ত্রুটির তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে পদ্ধতি পরিবর্তন ও প্রভাব খাটিয়ে ২০২২ সালে এই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) তথা সরকার আগামী চার বছরে ৬১৬ কোটি টাকার রাজস্ব এবং ৬৯ কোটি টাকার লভ্যাংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।

টেলিকম খাতের ওপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রের ‘কোয়েশ্চেনেবল লাইসেন্সিং ডিজাইন অ্যান্ড দ্য কনসোর্টিয়াম আউটকাম’ শীর্ষক অংশে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়।

ইতোমধ্যে সামিট, মেটাকোর ও সিডিনেট নামের তিনটি বেসরকারি কোম্পানির কার্যক্রম ও তাদের গঠিত ‘কনসোর্টিয়ামের বৈধতা’ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। লাইসেন্সিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলে বেসরকারি কোম্পানিটি তিনটি সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ তুলেছেন। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে ইতোমধ্যে বিটিআরসিকে এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিটিআরসি তিনটি বেসরকারি লাইসেন্স দিলেও প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা ক্যাবল স্থাপন না করে ‘বিপিসিএস’ নামে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে। তারা ক্যাবলের একটি মাত্র শাখার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার মূলনীতিকেই বাধাগ্রস্ত করেছে। আলাদা লাইসেন্স নিয়ে পুনরায় একক কনসোর্টিয়াম হিসেবে কাজ করা একটি বড় পদ্ধতিগত ত্রুটি। এর ফলে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ এক জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা ভূ-রাজনৈতিক সংকটে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।

করের টাকা অপচয়ের আশঙ্কা

বর্তমানে বিএসসিপিএলসির দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে ৭ হাজার ২২০ জিবিপিএস সক্ষমতা রয়েছে। তৃতীয় ক্যাবল চালু হলে মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে ৩৮ হাজার জিবিপিএস। আন্তর্জাতিক সংস্থা টেলিজিওগ্রাফির মতে, ২০২৭ সালে দেশের মোট চাহিদা হবে মাত্র ১৪ হাজার ৮১০ জিবিপিএস। অর্থাৎ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই চাহিদার প্রায় তিন গুণ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে বেসরকারি লাইসেন্স দেওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সক্ষমতার পাহাড় তৈরি হবে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের বিপুল বিনিয়োগ ও জনগণের করের টাকার অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আর্থিক ক্ষতির খতিয়ান

শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ক্যাবল পূর্ণমাত্রায় চালু হলে বাজারে ব্যান্ডউইথের মূল্যের অস্বাভাবিক পতন ঘটবে। এতে আগামী চার বছরে আর্থিক ক্ষতির তিনটি স্তর উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব কমতে পারে ২৪৯ কোটি টাকা। মধ্যম অবস্থায় রাজস্ব ক্ষতি ৪১৩ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা কমবে ১৮৬ কোটি টাকা। আর চরম সংকটকালে রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে ৬১৬ কোটি টাকা, যা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয়ের প্রায় দেড় গুণ।

শ্বেতপত্র অনুযায়ী, অনির্ভরযোগ্য ভেন্ডর বা বিদেশি অংশীদারযুক্ত বেসরকারি কনসোর্টিয়াম সাইবার স্পাইং ও তথ্যচুরির উচ্চঝুঁকি তৈরি করে। ফ্রান্স ২০২৪ সালে এলকাটেল সাবমেরিন নেটওয়ার্ককে (এএসএন) এবং ইতালি ২০২৫ সালে টেলিকম ইতালিয়া স্পার্কলকে জাতীয় নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয়করণ করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো নিরাপত্তার কারণে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও বাংলাদেশে তা উপেক্ষিত হয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যেখানে তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা ভেবে সাবমেরিন ক্যাবলের মতো একটি সংবেদনশীল অবকাঠামোকে বেসরকারি খাতে দিচ্ছে না বা থাকলেও এসব কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করছে, সেখানে বাংলাদেশে সাবমেরিন ক্যাবল বেসরকারি খাতে দেওয়াটা জাতীয় স্বার্থে সমীচীন নয়।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মোট ট্রাফিকের ৫০ শতাংশ সরকারি ক্যাবলের মাধ্যমে পরিচালনা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেসরকারি আইআইজিগুলো তা মানছে না। ফলে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সংকুচিত হচ্ছে। তাছাড়া বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও বিএসসিপিএলসিকে আইটিসি অপারেটরদের সমান হারে (৩ শতাংশ) রাজস্ব বণ্টন করতে হয়। এর ফলে বিএসসিপিএলসির মার্কেট শেয়ার ২০১৮ সালের ৬৫ শতাংশ থেকে বর্তমানে ৪০-৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বাজার স্থিতিশীল করতে এসএমডব্লিউ৬ (এই ক্যাবলটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (সিঙ্গাপুর), মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম ইউরোপ (ফ্রান্স)—এই তিনটি অঞ্চলকে সরাসরি যুক্ত করেছে) চালুর পরবর্তী ৩-৫ বছর বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা দরকার। এছাড়া বিএসসিপিএলসিকে ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো বেসরকারি ক্যাবল পরিচালনার আগে বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিশ্চিত করা।

এসব বিষয়ে বিএসসিপিএলসির সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আসলাম হোসেন আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, লাইসেন্সিং গাইডলাইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বা অন্যায্য প্রভাব খাটিয়ে এখন আর লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তিনটির পক্ষে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করা সম্ভব হবে না এবং নীতিমালা ভঙ্গের কারণে অচিরেই তাদের লাইসেন্স বাতিল হবে।’

ডিজেল-সারের সংকট, চড়া মূল্যে দিশাহারা কৃষক

পার পেয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতের লুটেরা সিন্ডিকেট

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলে হতাশা, ক্ষোভ

স্বচ্ছ পানির ফয়’স লেক এখন বিষাক্ত জলাধার

আওয়ামী আমলে বিসিএসে নজিরবিহীন জালিয়াতি

বাংলাদেশ সীমান্তে ‘আরেক কাশ্মীর’ সৃষ্টির শঙ্কা

গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ও সম্প্রীতির আবাহনে বাংলা নববর্ষ বরণ

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে

আশ্রয়-খাদ্য সংকটে মানবেতর জীবন লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশিদের

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জে নতুন সরকার