হোম > সারা দেশ

ডিজেল সংকটে সেচ ব্যাহত, বোরো উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

আমার দেশ ডেস্ক

দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন জেলার কৃষকরা। স্থানীয় পাম্প ও খুচরা বাজারে বেশি মূল্য দিয়েও প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ডিজেলের অভাবে কৃষি জমিতে সেচ দিতে পারছেন না তারা। মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ দিতে না পারায় বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল ও সবজি চাষ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।

রাজশাহীতে সেচ নিয়ে শঙ্কায় চাষি

উত্তরাঞ্চলের বোরো চাষিরা জ্বালানি সংকটের ফলে বিপাকে পড়েছেন। ডিজেলের অভাবে ক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না তারা। বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাজশাহীর বিস্তীর্ণ এলাকা ডিজেলের অভাবে সেচ পাম্প, নলকূপ ও কৃষিযন্ত্র বন্ধ আছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

কৃষকদের অভিযোগ, রাজশাহীর অধিকাংশ পাম্প বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় ডিজেল মিলছে না। আবার পাম্পের বাইরে খোলাবাজারে যেখানে ডিজেল মিলছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দিয়ারমানিক চর এলাকায় সেচের জন্য ডিজেল সংকট প্রকট। স্থানীয় কৃষক আবদুল্লাহ বিন সাফি জানান, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় হয়েছে।

নওগাঁর দুর্গাপুর উপজেলার ছিদ্র কলশিপুর গ্রামের মো. মোসলেম উদ্দিন বলেন, আমার বোরো ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। বিক্রেতাদের লিটারপ্রতি ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে চেয়েছিলাম, তারাও সংকটের কথা বলে দিতে রাজি হয়নি।

এদিকে সেচ পাম্পের চালকরা জানান, ডিজেলের অভাবে তাদের সেচ কার্যক্রম চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সংকটের কারণে তারা সেচের খরচ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমে প্রায় তিন লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এ অঞ্চলে সেচের মূল চালিকাশক্তি ডিজেলনির্ভর হওয়ায় বর্তমান জ্বালানি সংকটের ফলে বিশাল এলাকাজুড়ে বোরো ক্ষেতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

এ অঞ্চলে মোট সেচনির্ভর জমির প্রায় ২১ শতাংশই ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। অঞ্চলটিতে মোট গভীর নলকূপ রয়েছে ১১ হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে ডিজেলচালিত ৩১৫টি। অগভীর নলকূপের সংখ্যা এক লাখ ১০ হাজার ৪৪৯টি। এর মধ্যে ডিজেলচালিত ৮৮ হাজার ২৬৮টি। এছাড়া, আট হাজার ৬৪৭টি লো-লিফট সেচ পাম্পের মধ্যে সাত হাজার ৪৫৮টি পাম্প ডিজেলচালিত।

কুড়িগ্রামে চাষাবাদ-সেচ ব্যাহত

জ্বালানি তেলের সংকটে বিপাকে পড়েছেন কুড়িগ্রামের কৃষকরা। বোরো ধান ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন আবাদে সেচের ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানান তারা। জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েকদিন ডিজেলের সংকট থাকায় জমিতে পরিমাণমতো সেচ দিতে পারেননি তারা।

তবে বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা সুবিধা হয়েছে বলে জানান তারা। বৃষ্টি না থাকলে সামনের দিনগুলোতে ডিজেল সংকটের কারণে সেচ নিয়ে বিপাকে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন কৃষকরা।

জানা যায়, চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর ভাসমান তেলের ডিপো দুটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। ফলে কৃষকদের খুচরা বাজারে তেল কিনতে হয় অনেক বেশি দামে। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় বোরো ধান ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন আবাদে সেচ সমস্যা লেগেই থাকে।

রৌমারী উপজেলার ধোনারচর গ্রামের হযরত আলী বলেন, কয়েকদিন আগে ডিজেলের প্রচুর সংকট ছিল; এখনো কিছুটা আছে। ১০০ টাকা লিটারের তেল ১১৫ টাকায় কিনছি। বৃষ্টি হওয়ায় কয়েকদিন পানি দেওয়া না লাগলেও ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদ করতে তেল ঠিকই লাগছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, কুড়িগ্রামে এ বছর এক লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৩০ হাজার হেক্টর জমি শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। বাকি জমির সেচ দেওয়া হয় বিদ্যুৎচালিত পাম্প দিয়ে।

শেরপুরে বোরো নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

চলতি বোরো মৌসুমে ডিজেল সংকটে শেরপুরে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জেলায় অধিকাংশ সেচ যন্ত্রই ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানির অভাবে সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না কৃষকরা। এতে ধানক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে। সম্ভাব্য ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় চরম উদ্বেগে দিন কাটছে কৃষকদের।

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরে এবার ৯১ হাজার ৯৪৯ হেক্টর জমিতে কৃষকরা বোরো ধানের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমির সেচ নির্ভর করছে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের ওপর। জেলায় মোট ৩২ হাজার ৪০টি সেচযন্ত্রের মধ্যে ১৮ হাজার ৮৯০টিই ডিজেলচালিত। এসব যন্ত্র সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় পৌনে এক লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ডিজেল সংকটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক জমিতে পানি পৌঁছাচ্ছে না। সময়মতো পানি না পাওয়ার কারণে ধানের চারা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সদর উপজেলার কামারেরচর এলাকার কৃষক রহিম মিয়া বলেন, ডিজেল না পাওয়ায় ঠিকমতো জমিতে পানি দিতে পারছি না। প্রতিদিন সেচের জন্য ডিজেল দরকার, কিন্তু বাজারে সংকট চলছে। সময়মতো পানি না দিতে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

খুলনায় বোরো জমিতে সেচ ব্যাহত

বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ধান উৎপাদন নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত খুচরা পর্যায়ে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বোরো ধানের উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। জেলার কয়রা উপজেলার কৃষক গাজী সাহাবুদ্দিন জানান, টানা ৯ দিন ধরে ডিজেল না পাওয়ায় তার জমিতে পাম্পের মাধ্যমে সময়মতো পানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে জমি শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহে দুইবার চার লিটার করে ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে খুচরা বাজারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।

কয়রা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অনুতপ সরকার জানান, উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় এক হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। তবে গত সোমবার মজুদ ছিল মাত্র ৬৬৬ লিটার।

মানিকগঞ্জে বোরো-সবজি আবাদ ব্যাহত

মানিকগঞ্জে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বোরো আবাদে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকরা ডিজেল না পেয়ে তাদের জমিতে ঠিকমতো সেচ দিতে পারছেন না।

এদিকে ডিজেল না পেয়ে আরিচা-আলোকদিয়া এবং বাঘুটিয়াসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। তাদের চলাচলের একমাত্র বাহন ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলার বন্ধ থাকায় তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে চরাঞ্চল হতে শাক-সবজি আনা বন্ধ থাকায় শিবালয় বাজারে সবজির দাম বেড়েছে।

কৃষকরা ডিজেল না পেয়ে তাদের বোরো আবাদ প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে বলে জানিয়েছেন। এ বিষয়ে কাশাদহ পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি সফি উদ্দিন বলেন, সময়মতো তেল না পাওয়ায় আমরা জমিতে সেচ দিতে পারছি না। ফলে আমাদের এবারের ফসলের আবাদ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

জেলার শিবালয় উপজেলার ব্যবসায়ী জাহাংগীর জানান, শিবালয় বাজার প্রধানত চরাঞ্চলের সবজির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কিছুদিন যাবৎ বাজারে কৃষকরা না আসায় বাজারে সবজির দাম দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে বাজারে সবজি পাওয়াই মুশকিল হবে।

জেলার বিভিন্ন পাম্প পরিচালকরা দাবি করেন, তাদের নিকট কোনো প্রকার তেল মজুত নেই। সেজন্য তারা গ্রাহকদের তেল দিতে পারছেন না। তারা বলেন, আমরা তেল সরবরাহ না পেলে কিভাবে তেল দেব।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন রাজশাহী অফিস, খুলনা ব্যুরো, কুড়িগ্রাম, শেরপুর প্রতিনিধি, শিবালয় (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬

গাজীপুরে ২৭ শিশু হামে আক্রান্ত

রামগঞ্জে জ্বালানি সংকটে সেচ দিতে না পেরে দিশেহারা কৃষক

রংপুরে হত্যা মামলার আসামি ঢাকায় গ্রেপ্তার

সাপাহারে জ্বালানি তেল মজুত ও পাচার রোধে কড়া নজরদারি

নরসিংদী জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন

চাঁদা দিতে অস্বীকার, যুবদল নেতাকে তুলে নিয়ে হাত-পা ভাঙলেন বিএনপি নেতা

নবাবগঞ্জে অতিরিক্ত দামে পেট্রোল বিক্রি, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

সিদ্ধিরগঞ্জে ৯ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ

মেহেরপুরে ৫ হাজার ৩৭৫ লিটার ডিজেল জব্দ