পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বজুড়ে যখন পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে, তখন বাংলাদেশে সরকারি নীতিগত ঘোষণার পরও প্রত্যাশিত প্রসার পায়নি কংক্রিট ব্রিকস ও ব্লক শিল্প।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, জনসচেতনতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ায় বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা অনেক কংক্রিট ব্রিকস ও ব্লক কারখানা এখন অস্তিত্বের সংকটে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে সরকারি নির্মাণকাজে পর্যায়ক্রমে পোড়া মাটির ইটের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩০ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি নির্মাণকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত মাটির ইটের উৎপাদন ও ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। ফলে একদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব শিল্পের উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিতে উৎপাদিত কংক্রিট ব্রিকস, হোলো ব্লক, সলিড ব্লক ও ইউনি ব্লক তৈরিতে ব্যবহার করা হয় পাথরের খোয়া, সিলেট বালি, উন্নতমানের সিমেন্ট এবং অন্যান্য মানসম্মত উপকরণ। স্বয়ংক্রিয় মেশিনে উৎপাদিত এসব পণ্যে নির্ধারিত শক্তিমাত্রা (পিএসআই) বজায় রাখা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে লবণ প্রতিরোধী রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা নির্মাণকে দীর্ঘস্থায়ী করে। পাশাপাশি তাপ ও শব্দ নিয়ন্ত্রণেও এসব ব্লক কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার আভা কংক্রিট ব্রিকস অ্যান্ড ব্লক ফ্যাক্টরির চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, `পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথা চিন্তা করে আমরা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক কারখানা স্থাপন করেছি। সরকারের পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ঘোষণায় উৎসাহিত হয়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছি।
কিন্তু পর্যাপ্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রচার ও প্রকল্পভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় অধিকাংশ কারখানা আজ সংকটে। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেকগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সরকারকে এ শিল্পের প্রতি আরও গুরুত্ব দিতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি সব উন্নয়ন প্রকল্পে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’
উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী সুব্রত রায় বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কংক্রিট ব্লক কারখানা পরিদর্শন করেছি এবং তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত। বর্তমানে সরকারের কিছু উন্নয়ন প্রকল্পে ইউনি ব্লক ও কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ইউনি ব্লক দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। প্রচলিত ইটের সলিং রাস্তা বা বিটুমিন কার্পেটিংয়ের তুলনায় ইউনি ব্লক অধিক টেকসই ও নান্দনিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভবন নির্মাণে হোলো ব্লক ব্যবহার করলে কাঠামোর ওজন কমে, তাপ ও শব্দ নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয় এবং সিমেন্ট, বালু ও শ্রম ব্যয় কম লাগে। সঠিক মান বজায় রেখে নির্মাণ করলে এটি ভূমিকম্প সহনশীলতাও বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। তাই পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো উচিত।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভবন মালিক খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমি আমার নির্মাণাধীন মার্কেটে প্রচলিত মাটির ইটের পরিবর্তে হোলো ব্লক ব্যবহার করেছি। এতে নির্মাণ ব্যয় ও সময় দুটোই কমেছে। পাশাপাশি সিমেন্ট ও বালুর ব্যবহারও তুলনামূলক কম হয়েছে। তাই পরিবেশবান্ধব এই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি সংরক্ষণ, বায়ুদূষণ হ্রাস এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
তারা বলছেন, সরকারি নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করা হলে দেশের কংক্রিট ব্রিকস ও ব্লক শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।
পরিবেশবিদ ও সরকারি শিরি বাংলা ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ আনিসুর রহমানের অভিমত, পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণশিল্পে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও ক্রমশ কমে যেতে পারে।
এমএইচ