চট্টগ্রাম নগরীর প্রবেশদ্বারে কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত ঐতিহাসিক কালুরঘাট সেতুটি এখন বোয়ালখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষের নিত্যদিনের চরম দুর্ভোগ ও কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ১০ মিনিটের পথ পার হতে বর্তমানে চালক ও যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে।
১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার মূলত ট্রেন চলাচলের জন্য এই সেতুটি নির্মাণ করে। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে এটি সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। একমুখী সেতু হওয়ায় একপাশের গাড়ি পার হওয়ার পর অন্যপাশের গাড়িকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমানে বোয়ালখালী উপজেলার প্রায় তিন লাখ বাসিন্দা ছাড়াও পটিয়ার উত্তর প্রান্ত এবং দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ার মানুষ এই জরাজীর্ণ সেতু দিয়েই চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত করেন। প্রায় ৯৫ বছরের পুরোনো এই সেতুটি বিগত তিন দশক ধরে জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটির ওপর দিয়েই এখন ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ভারী যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করছে। বিশেষজ্ঞরা দুই দশক আগেই এটিকে ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আক্ষেপ, চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) সংসদীয় আসনের পশ্চিমপাড়ে নগরীর অংশে আলো ঝলমলে উন্নয়ন হলেও পূর্বপাড়ের বোয়ালখালী অবহেলিত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে এই কালুরঘাট নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জোরালো হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী এমপি ও মন্ত্রীরা ভোটের পর তা ভুলে যান। সাবেক মন্ত্রী এম মোরশেদ খান এবং জাসদ নেতা প্রয়াত মঈন উদ্দিন খান বাদল এই সেতুর জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। ২০১৯ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে মঈন উদ্দিন খান বাদল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেতুর আকুতি জানিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদও এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে পরপারে চলে যান। পরবর্তীতে নোমান আল মাহমুদ ও আবদুস সালামসহ একাধিক নেতা এই সেতুকে নির্বাচনি প্রধান ইস্যু করেছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের মে মাসে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ ও ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। ২০২৬ সালে মূল কাজ শুরু করে ২০৩০ সালের মধ্যে যান চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে প্রকল্পটির গতি এখনো ধীর।
এদিকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর চট্টগ্রাম-৮ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ আবার কালুরঘাট নতুন সেতু নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এখন দেখার বিষয়, বর্তমান মেয়াদে বোয়ালখালীবাসীর এই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়, নাকি এটি চিরদিনের মতো স্বপ্নই থেকে যায়।