কক্সবাজারের আলোচিত উপজেলা উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড় ধসে খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানা শিক্ষার্থীদের নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮ হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকেই। সন্ধ্যা ৬টার দিকে এই রিপোর্ট লেখাকালীনও ৫ নম্বর ক্যাম্পের ওই পাহাড় ধসের ঘটনায় উদ্ধার অভিযান চলছিল।
বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার ক্যাম্প-৫ এর ইরানি পাহাড় এলাকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ভয়াবহ পাহাড়ধসের এই ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার ও ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) আব্দুর রউফ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানান, তিনি ঘটনাস্থল ঘুরে এসে ৮ জনের মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছেন। এদের মধ্যে দুই শিশুর লাশ তিনি নিজেই দেখেছেন। অন্যরা হাসপাতালে নেয়ার পর মারা গেছে। তবে দাপ্তরিকভাবে আটজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
তবে পাহাড় ধসের এই ঘটনায় নিহত চারজনের নাম পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরা হলো ব্লক-১১ এর বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুরের মেয়ে উম্মে নেজাতুল (১৩), ক্যাম্প-৩ এর আবদুস শুক্কুরের মেয়ে উম্মে সালমা (১২) ও ব্লক-৮-এর মোহাম্মদ ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)।
আহতদের মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া তিনজন হলো ক্যাম্প-৩ এর দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা (৯), নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫) ও ক্যাম্প-৫এর বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)। বাকি আহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ধসের সময় খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন ছাত্রী পাঠ গ্রহণ করছিল। হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ভবনের উপর পড়ে। এতে ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী মাটিচাপা পড়ে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন নিজ উদ্যোগে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। যদিও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার ৪০-৫০ শিক্ষার্থী চাপা পড়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন।
উখিয়ায় দায়িত্বরত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন সাংবাদিকদের বলেন, ক্যাম্প-৫ এর ইরানি পাহাড় এলাকায় অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে চার ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
১৪ এপিবিএনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে ক্যাম্প-৫ এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক চার শিক্ষার্থীকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত সাতজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এদিকে ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পাহাড়ধসে একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসার ভেতরে শিশুরা অবস্থান করছিল। ঘটনার পরপরই রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্য এবং ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম উদ্ধার ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করে। সম্ভাব্য হতাহতদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আশপাশের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র গুলোকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এ নিয়ে গত তিনদিনে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন রোহিঙ্গা।
এর আগে সোমবার দিবাগত রাতে টানা বর্ষণের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। একইদিন দুপুরে পেকুয়া উপজেলায় পাহাড়ধসে বসতঘরের দেয়াল চাপা পড়ে সাত বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, গত রোববার থেকে বুধবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৫০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।