হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যার নেপথ্যে রমরমা মাটির ব্যবসা

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

রাত তখন সোয়া ১টা। সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলা ও কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহনী এলাকার অন্ধকার চিরে হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটছিল একটি ডাম্পার ট্রাক। পেছনে ছিল একটি জাপানি এক্সকাভেটর। ট্রাকের চাকায় তখনও লেগেছিল পাহাড়ের লাল মাটি। সেদিন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় দুই শ্রমিক। অথচ যাদের নির্দেশে পাহাড় কেটে মাটি সরবরাহ করা হয়, তারা ঠিকই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

চলতি বছরের জানুয়ারির একটি রাতের ঘটনা এটি। কিন্তু সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার পাহাড়ে প্রায় প্রতি রাতেই চলে এমন নীরব ধ্বংসযজ্ঞ। ইটভাটার জন্য ফসলি জমির মাটি কেটে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য জমিকে পরিণত করা হয়েছে গভীর জলাশয়ে। গত দুই দশক ধরে চলা এই পরিবেশ ধ্বংসের মূল্য এবার দিতে হচ্ছে সমতলের মানুষকে—ঘরে কোমরসমান পানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে যাওয়া, সাঁকো ভেসে যাওয়া এবং প্রায় তিন লাখ মানুষের পানিবন্দি জীবন দিয়ে। এমনটাই বলছেন পরিবেশবিদরা।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এখন পানির নিচে। পরিবেশবিদদের মতে, এই বন্যার জন্য শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়; এর পেছনে রয়েছে পাহাড় কাটা, খাল-জলাশয় ভরাট, অবৈধ ইটভাটার বিস্তার এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের দীর্ঘদিনের প্রভাব।

গত ৬ জুলাই শুরু হওয়া টানা বর্ষণ ৮ জুলাইয়ের মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নেয়। সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় সব এলাকা প্লাবিত হয়। ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে পৌরসভা ও রামপুর এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে। সাঙ্গু নদীর পানি উপচে বাজালিয়া, ছদাহা ও কেঁওচিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদ তলিয়ে যায়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, একাধিক স্থানে সাঙ্গু ও ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর তারা পেয়েছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, শুধু সাতকানিয়াতেই প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। লোহাগাড়ার আমিরাবাদ, পদুয়া, আধুনগর, চুনতি, বড়হাতিয়া, পুটিবিলা, কলাউজান ও চরম্বা ইউনিয়নের অধিকাংশ বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। ডলু নদী ও হাতিয়ার খালের ভাঙনে বহু গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দানুরমার ঘাটের সাঁকো ভেঙে কয়েকটি গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও তা বিপুলসংখ্যক দুর্গত মানুষের তুলনায় অপ্রতুল।

পাহাড়ের বুকে রাতভর ধ্বংসযজ্ঞ

সম্প্রতি সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলা এলাকার যেখানে এক সময় পাহাড় ছিল, এখন সেখানে সমতল লালচে মাটির ক্ষত। স্থানীয়দের ভাষায়, এখানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই এলাকার পাহাড় কেটে মাটি পাচার করা হয় পাশের বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের লটমনি মৌজায় অবস্থিত চারটি অবৈধ ইটভাটায়। দুই উপজেলার প্রশাসনিক সীমানার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে এই পরিবেশ ধ্বংসের কাজ।

স্থানীয় এক ইটভাটা মালিকের ভাষায়, লটমনি এলাকার ভাটাগুলো পাহাড় কাটলেও সংবাদ প্রকাশের পর অভিযানের মুখে পড়তে হয় সাতকানিয়ার মালিকদের। ফলে প্রশাসনিক সীমার ফাঁক যেমন পাহাড়খেকোদের সুবিধা দেয়, তেমনি দায় চাপানো হয় অন্যদের ওপর।

২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর একটি মামলা করলেও তা থেকে বাদ পড়ে পাহাড় ধ্বংসের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত জেবিএম, এইচবিএম ও ওয়ানস্টার ইটভাটার মালিকদের নাম। অর্থের প্রভাবেই তারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি লোহাগাড়ার প্রভাবশালী এক ব্যক্তি, যিনি এলাকায় ‘পাহাড়খেকো’ নামে পরিচিত এবং যার হাতে এক সাংবাদিক লাঞ্ছিত হয়েছিলেন, তিনি এখন এওচিয়ার একটি ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বলে সূত্র জানায়।

এই এক এলাকার চিত্রই বলে দেয় পুরো অঞ্চলের বাস্তবতা। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, ইটভাটার মাটির ক্ষুধা আর ভূমিদস্যুদের লোভে নির্বিচারে চলছে পাহাড়-টিলা নিধন। গত দুই দশকে সারা দেশে পাহাড়ধসে পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে, যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত এই পাহাড় কাটার বিষয়টিই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় বৈধ ইটভাটার সংখ্যা ১২০টি। এর বিপরীতে অনুমোদন ছাড়া চলছে আরো তিন শতাধিক ইটভাটা। উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এসব ভাটার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাতকানিয়ায় একবার হাইকোর্টের নির্দেশে একটি ইটভাটা বন্ধ হলেও তালিকা তৈরি করে দায় সারার অভিযোগ ওঠে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এক্ষেত্রে জনবল ও আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন। তারা বলেন, সারা দেশে মাত্র দুটি পরিবেশ আদালত এবং সীমিতসংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকায় পাহাড় কাটা ও অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আমরা অভিযান পরিচালনা করি না। পাহাড়, মাটি বা বালু উত্তোলনের খবর পেলেই অভিযান চালানো হয়। তবুও থামানো যাচ্ছে না। জনসচেতনতা না বাড়লে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

রেললাইন উন্নয়নের প্রতীক, নাকি নতুন বাঁধ

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময় জানানো হয়েছিল, ১০২ কিলোমিটার পথে নির্মাণ করা হয়েছে ৩৯টি সেতু এবং প্রায় আড়াইশ কালভার্ট। ফলে পানিপ্রবাহে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু এবারের বন্যায় দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের ওপর দিয়ে ১৫ থেকে ২১ ইঞ্চি উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ সরেজমিন পরিদর্শন করে জানান, রেললাইনটি পাঁচ ফুট পর্যন্ত উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, পর্যাপ্ত সেতু ও কালভার্ট না থাকলে উঁচু রেললাইন কৃত্রিম বাঁধের মতো কাজ করবে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হবে এবং রেললাইনের এক পাশে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হবে। এবারের বন্যায় সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন এলাকায় সে ধরনের বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে।

পরিবেশবিদ ও গবেষক ইদ্রিস আলীর মতে, পাহাড় কাটা শুধু পাহাড়ের ক্ষতিই করে না, ওই মাটি গিয়ে জমা হয় খাল, পুকুর ও জলাশয়ে। অন্যদিকে ফসলি জমি ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন বসতি ও স্থাপনা। ফলে এলাকার প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত থাকলে এলাকার পানি ধারণক্ষমতা কমে যাবে আর তার সরাসরি পরিণতি হবে বর্ষা মৌসুমের আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায়।

পানিবন্দি মানুষের পাশে থাকবে সরকার: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

বাঁশখালীর বন্যাদুর্গত এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ, দুজনের মুত্যু

মেঘনায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গ্রেপ্তার

৩০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে সেই মা হাতির মৃত্যু

কক্সবাজারে আবার পাহাড়ধস: মাটিচাপায় স্ত্রীর মৃত্যু, প্রাণে বাঁচলেন স্বামী

ছাত্রকে দিয়ে এসএসসির খাতা মূল্যায়ন, প্রধান শিক্ষকসহ গ্রেপ্তার ২

বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে পলাতক আসামি ছিনতাইয়ের অভিযোগ

বান্দরবানে বানভাসি মানুষের মানবেতর জীবন

বাড়ির উঠানে বন্যা, পানিতে ডুবে দেড় বছরের শিশুর মৃত্যু

মাটিরাঙ্গায় ভাড়া বাসায় যুবকের লাশ উদ্ধার