বৈরী আবহাওয়ার কারণে টানা বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকার সড়ক তলিয়ে গেছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও দৈনন্দিন কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা গেছে। ফুটপাতের দোকানগুলোতে ক্রেতা নেই বললেই চলে, রাস্তায় যানবাহনের গতি ধীর। কখন আবার ঝুম বৃষ্টি নেমে আসবে, সেই আশঙ্কায় অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
নগরীতে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭.৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অবশ্য দাবি করছে, খাল ও নালা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার কারণে রেকর্ড বৃষ্টির পরও পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকেনি। বেশির ভাগ এলাকার পানি বৃষ্টি কমার পর দ্রুতই নেমে গেছে।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে, পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকায় দেয়াল ধসে শফিকুর রহমান নামে এক মাছ ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। তার পরিবারের আরো তিনজন আহত হয়েছেন। পতেঙ্গা সৈকতসংলগ্ন নির্মাণাধীন সড়কের একাংশ ধসে পড়ায় টানেল ও বিমানবন্দরমুখী আউটার রিং রোডে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। টাইগারপাস এলাকায় সড়কের ওপর উপড়ে পড়েছে বেশ কিছু গাছ।
দুর্যোগের আঁচ লেগেছে যোগাযোগব্যবস্থায়ও। রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল। প্রতিকূল আবহাওয়ায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি দুটি আন্তর্জাতিক ও একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাস কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, ৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি থাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ছয়জন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে চলছে মাইকিং। আর পাহাড়সংলগ্ন স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-মসজিদকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে। নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়ের ঢাল থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে উচ্ছেদ অভিযানও চালাচ্ছে জেলা প্রশাসন। উদ্ধারকাজে মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১০১ সদস্যের একটি বিশেষ র্যাপিড রেসপন্স টিম।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। শুধু মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা—এই তিন ঘণ্টাতেই ঝরেছে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি।
আবহাওয়াবিদেরা ব্যাখ্যা করছেন, এখন বর্ষা মৌসুমের মধ্যভাগ। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের কারণে ঘন ঘন মেঘ তৈরি হচ্ছে। আর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় থাকায় চট্টগ্রাম বিভাগে দফায় দফায় ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায়ও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার উচ্চ ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে।
এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ১১ জুলাইয়ের পর থেকে বৃষ্টিপাত ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে, তবে তার আগ পর্যন্ত নদ-নদীর পানি বেড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা ও নগরে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। জোয়ারের সময় সাগরে পানি নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেডএম