টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত বর্জ্য ও ময়লাযুক্ত পানিতে দূষিত হচ্ছে খাল-বিল। প্রবহমান খাল দিয়ে ক্যাম্পের দূষিত ও মারাত্মক দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি নাফ নদীতে চলে যাচ্ছে সরাসরি। এতে করে খাল ও বিলের পানি যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি নাফ নদীর পানিও সমান তালে দূষিত হচ্ছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ময়লাযুক্ত বিষাক্ত পানির কারণে আশেপাশের খাল-বিলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া বিলে এবং নদীতে মৎস্য উৎপাদন দিন দিন কমে আসছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালী খাল, মুচনী ছুরি খাল, জাদীমুরা জাদীর খাল, উনছিপ্রাং রইক্ষ্যং খাল ও ওমর খালের পানি একেবারে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত বর্জ্য ও ময়লাযুক্ত পানি খালের পানির সঙ্গে একাকার হয়ে পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতি করছে। পানির রঙ পরিবর্তন হয়ে কালো রঙ ধারণ করেছে।
এখানকার স্থানীয় লোকজন যুগ যুগ ধরে ওইসব খালের পানি নিয়ে শুষ্ক মৌসুমে ক্ষেত খামার করত। পানির রঙ অস্বাভাবিক পরিবর্তন হওয়ায় ক্ষেত খামার করতে পারছেন না এখানকার কৃষকরা।
উল্লেখিত পাঁচটি খাল প্রবাহমান থাকায়, লবণ চাষিদের যেমন কষ্ট হচ্ছে, তেমনি লবণ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন লেদা এলাকার কৃষক জুবায়ের ও ফরিদ। তিনি আরো জানান, পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি লবণ মাঠেও ব্যবহার করা যায় না। ওই পানিতে তেমন লবণ উৎপাদন হয় না। ক্যাম্পের বর্জ্য এবং ময়লাযুক্ত পানির কারণে নদীর পানি খালে ঢুকতে পারে না বলেও লবণ চাষিদের অভিযোগ। ফলে লবণ চাষিদের প্রতি বছর ক্ষতির মাশুল গুনতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে ছয়টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। ইউনিয়নের মাত্র চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ক্যাম্পগুলোর অবস্থান। এসব ক্যাম্পে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
টয়লেটসহ ৭০ ভাগ বর্জ্য আশেপাশের খালের ওপর দিয়ে নদীতে চলে যাচ্ছে। এই কারণে বর্ষা মৌসুমেও এখানকার খালের পানির রঙ স্বাভাবিক থাকে না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অপরদিকে স্থানীয় লোকজন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ক্যাম্পের ময়লাযুক্ত পানি ও বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন।
লবণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হোসাইন আনিম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ময়লাযুক্ত পানি ও বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে লবণচাষিরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ময়লাযুক্ত পানি ও বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে চাষিরা ঠিকমতো লবণ মাঠে সেচের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এছাড়া ময়লাযুক্ত পানির কারণে আলীখালী, লেদা ও মুচনীতে লবণ উৎপাদন কম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন লবণ ব্যবসায়ীদের এই নেতা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ময়লা-আবর্জনায় উল্লেখিত খাল সমূহের পানির গুণাগুণ একেবারেই নষ্ট হয়ে পড়ে। ওই পানি কোনো প্রকার ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করা যায় না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ময়লাযুক্ত পানি ও বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তিনি ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অবগত করেছেন বলে জানান।
টেকনাফ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী ফারুক হোসেন জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিষাক্ত বর্জ্য ও দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা দূষিত হচ্ছে পানি। স্থানীয়দের ব্যবহারের এই খাল দূষণমুক্ত রাখা ক্যাম্প সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ক্যাম্পের বর্জ্য ও বিষাক্ত পানি আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় শোধনাগারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রকৌশলী ফারুক। অন্যথায় ক্যাম্প থেকে নির্গত বর্জ্য ও বিষাক্ত পানিতে পরিবেশের ক্ষতি হবে। তিনি আরো বলেন, বিষাক্ত পানির ফলে স্থানীয় লোকজন ও রোহিঙ্গারা নানান রোগে আক্রান্ত হবে।