হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

স্বস্তির প্রচারের পর শঙ্কা বাড়ছে নির্বাচনের দিন ঘিরে

চট্টগ্রামের ১৬ আসন

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রচারের শেষ দিন আজ। চট্টগ্রামের ১৬ আসনে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার শেষ করছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। যদিও তফসিল ঘোষণার আগের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মহানগরীর তিনটি আসন ছাড়াও জেলার আরো তিনটি আসনে ছিল অস্ত্রের ঝনঝনানি। রাজনৈতিক সহিংসতা আর আধিপত্যের কোন্দলে ২৪ জন মানুষ খুন পর্যন্ত হয়েছেন। এতে নির্বাচন ঘিরে চিন্তার ভাঁজ ছিল প্রশাসনের প্রতিটি কর্মকর্তার কপালে।

তবে প্রার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং নেতাকর্মীদের সহনশীল মনোভাবের কারণে অনেকটা নির্বিঘ্নে শেষ হতে চলেছে উৎসবমুখর নির্বাচনি প্রচার। তবে নির্বাচনের দিনকে কেন্দ্র করে শঙ্কা রয়েছে এখনো। কারণ প্রবাসী ও ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা এখনো কমানো যায়নি খুব একটা। এর পাশাপাশি পলাতক আওয়ামী লীগ আর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের নির্বাচন বানচালের হুমকি-ধমকিও বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছে প্রশাসন। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার দাবি নির্বাচন বানচালের যে কোনো ষড়যন্ত্র শক্ত হাতে মোকাবিলা করার সক্ষমতা রয়েছে তাদের।

জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে চট্টগ্রামে। যদিও এসব গ্রুপের প্রধানদের বেশিরভাগই রয়েছে বিদেশে। তারপরও এলাকাভিত্তিক শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে অনেকে। আর নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে রাজনৈতিক ছত্রছায়া পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধ ও গ্রুপিংয়ের সুযোগ নেয় সন্ত্রাসীরা। বিশেষ করে জেলার রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, নগরীর বায়েজিদ, চাঁন্দগাও, বাকলিয়া এলাকার কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ ওঠে। তাদের ছত্রছায়ায় অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। রাজনৈতিক মিছিল সমাবেশে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অংশগ্রহণ আতঙ্ক ছড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে।

বিশেষ করে গত ৫ নভেম্বর বিএনপি প্রার্থী ঘোষণার পরদিন নির্বাচনি প্রচারে বেরিয়ে হামলার শিকার হন নগর বিএনপির সভাপতি এরশাদউল্লাহ চৌধুরী। এই হামলায় নিহত হন এরশাদউল্লাহর জনসংযোগে অংশ নেওয়া সারোয়ার বাবলা নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী। এ সময় এরশাদউল্লাহ নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।

এর আগে রাউজানে আধিপত্যের লড়াইয়ে নিয়মিত বিরতিতে খুন হন অন্তত ১৪ জন। এদের অধিকাংশই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী। নিহতদের কেউ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী অথবা উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ডেও একাধিক খুনের ঘটনা ঘটে। বহিষ্কৃত যুবদল ও সাবেক এক ছাত্রদল নেতার অনুসারীদের দ্বন্দ্বে অন্তত ৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

এই সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে পলাতক আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে ঝটিকা মিছিলের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ করে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর অপচেষ্টা করে তারা। বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রধারীদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সবার মধ্যে। অনেকেই ধারণা করেন আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে এই সংঘাত ও খুনোখুনি আরো বাড়বে।

কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে শুরু হয় উৎসবমুখর নির্বাচনি প্রচার। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটেনি খুব একটা। কথার মারপ্যাঁচ আর রাজনৈতিক বক্তব্য বিবৃতিতে এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীকে ঘায়েল করার চেষ্টা করলেও তা সংঘাতে রূপ নেয়নি এবারের নির্বাচনে।

নির্বাচনের দিন ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ প্রধান চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনি প্রচারের সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পর এখন নির্বাচনের দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিশেষ করে প্রবাসী দুই মাফিয়ার নেতৃত্বে থাকা এলাকাভিত্তিক ৫টি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। কারণ এই দুই গ্রুপের সদস্যরা সবাই ভাড়াটিয়া শুটার হিসেবে পরিচিত। এগুলো হলো—সাজ্জাদ আলী খান গ্রুপ এবং হাবিব খান গ্রুপ। দুজনই এইট মার্ডার মামলার আসামি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তাদের অনুসারীরা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে বড় সাজ্জাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামজুড়ে সংঘটিত অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই দুই গ্রুপের নাম উঠে এসেছে বলে আইনশৃঙ্খলা–রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি।

বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে বড় সাজ্জাদের ‘সখ্য’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, বর্তমানে বড় সাজ্জাদ অবস্থান করছেন ভারতের পাঞ্জাবে। তবে তার বাহিনী চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সাজ্জাদের নেতৃত্বে থাকা পুরোনো চক্রটি ৫ আগস্টের পর সক্রিয় হয়েছে। এলাকাভিত্তিক কয়েকটি গ্রুপ তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে। বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে সক্রিয় আছেন কারাগারে থাকা ছোট সাজ্জাদ, শহিদুল ইসলাম বুইস্যা, মোবারক ইমন, ও শুটার রায়হান আলম।

বর্তমানে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা যিনি চট্টগ্রামের একটি আসন থেকে ধানের শীষের নির্বাচন করছেন তার সঙ্গে বড় সাজ্জাদের সখ্য থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এরশাদউল্লাহর জনসংযোগে খুন হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ডের পর, বাবলার ভাই ইমরান আজিজ প্রকাশ্যেই ওই বিএনপি নেতার নাম উল্লেখ করে অভিযোগ তোলেন। ইমরানের দাবি, ভাইকে খুন করার আগে ও পরে বড় সাজ্জাদ গ্রুপ ধারাবাহিকভাবে ওই নেতার নির্দেশেই কাজ করেছে। যদিও বিএনপির ওই কেন্দ্রীয় নেতা এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। এছাড়া সম্প্রতি উত্তর জেলা বিএনপির এক প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারে অংশ নিয়েছে শুটার রায়হান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের ফুটেজ ভাইরাল হলে এ ব্যাপারে কিছু না জানার দাবি করেন বিএনপির ওই প্রার্থী।

হাবিবের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠতা’ আছে একাধিক জামায়াত নেতার

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক পরিচিত নাম হাবিব খান বর্তমানে অবস্থান করছেন ইতালিতে। তার স্থানীয় নেটওয়ার্ক এখন সক্রিয় হয়েছে বলে তথ্য আছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। হাবিবের দলকে নিয়ন্ত্রণ করছেন জামায়াতের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগরের সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির পক্ষে কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ কেন্দ্র দখল কিংবা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে হাবিবের বাহিনীও মাঠে নামবে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া শিবিরের এক চিহ্নিত ক্যাডার পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে।

কী বলছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা

চট্টগ্রামের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, আসন্ন সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে আগে থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাকে পর্যালোচনা করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। এছাড়া ১১৫ জন ম্যাজিস্ট্রেট সক্রিয় থাকবেন। যেকোনো কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৫ মিনিটের দূরত্বে স্ট্রাইকিং ফোর্সের অবস্থান থাকবে। যে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রয়েছে। তবে সে শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে বলে মনে হয় না। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে আসছে। তাদের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ আছে।

তিনি আরো বলেন, পতিত ফ্যাসিস্ট অপশক্তি কিংবা কোনো দুষ্কৃতকারী যদি নির্বাচনের সুযোগ ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চায় তবে তার জবাব তিনি পেয়ে যাবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে সব প্রার্থী, রাজনৈতিক দলের কর্মী ও ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানাব উৎসবমুখর প্রচারের মতো নির্বাচনের দিনটিও উৎসবমুখর করতে প্রশাসনকে যেন সবাই সহযোগিতা করে।

ফেনীতে জামায়াত কর্মীকে তুলে নিয়ে মারধর, অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জামায়াত প্রার্থীর গাড়িতে হামলার অভিযোগ

সালাহউদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ছেন জামায়াতের ফারুক

ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যৌথ বাহিনীর মহড়া

কক্সবাজারে অস্ত্রসহ যুবক আটক, সাংবাদিককে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ

সালাহউদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন জামায়াতের তরুণ ফারুক

নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ঝুঁকি নিরসনে মহড়া অনুষ্ঠিত

দেবিদ্বারে নিজ গ্রামের ভোটকেন্দ্রেই ভোট দেবেন হাসনাত আবদুল্লাহ

কক্সবাজারে ভোটের আগের রাতে গোপন প্রচার ও কালো টাকা বিতরণের অভিযোগ

ভোটই যেন এবারের ঈদ, নাগরিকের দায়িত্ব পালনে বাড়ি ফিরছে মানুষ