হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

পুলিশের হেনস্তা: হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন ক্রিকেটার নাঈম

চট্টগ্রাম ব্যুরো

ছবি: আমার দেশ

রাত তখন সাড়ে ১১টা। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের মাঠ থেকে ফিরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নেমেছেন মাত্র। ক্লান্ত শরীর, বাড়ি ফেরার তাড়া। একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসান। গন্তব্য নিজের শহরেই নিজের বাড়ি। কিন্তু সেই বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানো আর হলো না সহজে।

চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজার ফ্লাইওভারের মুখে হঠাৎ থামানো হলো গাড়ি। ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন তাকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক তুলে নিল নিজেদের গাড়িতে। শুরু হলো মারধর। গাড়িতে মারধর, থানায় নিয়েও মারধর। কিল, ঘুষি, লাথি।

একপর্যায়ে নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দিলেন নাঈম। কিন্তু সেই পরিচয়েও টলানো গেল না তাদের। ফোন কল আসার পর পরিচয় নিশ্চিত হতেই বদলে গেল পুলিশের মনোভাব। পরদিন সকালে নিজের নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ ক্রিকেটার। যে মানুষটি দেশের জার্সি গায়ে মাঠে লড়েন, ট্রফি হাতে হাসেন- তিনি সেদিন ক্যামেরার সামনে কাঁদলেন।

মোহাম্মদ নাঈম হাসান। জন্ম ২০০০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট অভিষেক সেটিও ছিল মাইলফলক, কারণ তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন সহস্রাব্দে জন্ম নেওয়া প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার। ৬ ফুট লম্বা এই অফস্পিনার দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত নাম। জাতীয় দলেও নিয়মিত আসা-যাওয়া। সম্প্রতি আসন্ন জিম্বাবুয়ে টেস্ট সিরিজের দলেও তাকে রাখা হয়েছে।

ক্রিকেটের মাঠে যে মানুষটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, দেশের মানুষের ভালোবাসায় বড় হন, সেই মানুষটিই নিজের শহরে রাতের বেলায় পরিণত হলেন 'আসামি'-তে।

২০২৪-এর সেই দিনগুলোয় নাঈম

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। বাংলাদেশের রাজপথ তখন উত্তাল। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায়, পুলিশের গুলিতে ঝরছে তরুণ প্রাণ। একটি আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে গণঅভ্যুত্থানে। লক্ষ্য শেখ হাসিনার পতন। সেই উত্তাল সময়ে চুপ থাকেননি নাঈম হাসান।

২০২৪ সালের ১৭ জুলাই তিনি ফেসবুকে লেখেন, আর যেন খালি না হোক কোনো মা-বাবার বুক, চাই শান্তিপূর্ণ সমাধান। সঙ্গে জুড়ে দেন 'শান্তিতে থাকুক আমার এই প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ।'

পহেলা আগস্টের পর থেকে তিনি আরও সরাসরি ছাত্রদের পক্ষ নেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন পোস্ট করেন বাংলাদেশের পতাকার ছবিতে লেখা 'স্বাধীন'। সেদিনই লেখেন, "Alhamdulillah, Today, we pay tribute to the brave students..." সেই পোস্টগুলো তখন লাখো মানুষ শেয়ার করেছিল। একজন জাতীয় ক্রিকেটার যখন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে জনতার পাশে দাঁড়ান—সেটি সাধারণ মানুষের কাছে সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সেই রাতের ঘটনাক্রম

শুক্রবার (১২ জুন) রাত সাড়ে ১১টা। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে সিএনজিতে বাড়ি ফিরছিলেন নাঈম। লালখানবাজার ফ্লাইওভারের মুখে পৌঁছাতেই পুলিশ গাড়ি থামায়। প্রথমে সিএনজিচালকের কাগজপত্র চাওয়া হয়। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

নাঈম জানান, সাদা পোশাকে থাকা একজন ও দুই পুলিশ সদস্য তাকে মারধর শুরু করে। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেন আমার গলা চেপে ধরছেন?’ — জবাবে তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। তারপর জোর করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়।

খুলশী থানায় নেওয়ার পরও থামেনি নির্যাতন। নাঈম জানান, থানার ভেতরে ওসির সামনেই তাকে আবার হেনস্তা করা হয়। কিল, ঘুষি ও লাথি মারা হয়। তাকে 'আসামি' বলে সম্বোধন করা হয়, কথা বলতে নিষেধ করা হয়।

নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়ার পরেও পুলিশ কর্ণপাত করেনি। পরে ফোন কলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের আচরণ পাল্টায়।

ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়ে বলেছে, একজন জাতীয় ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত দুঃখজনক। বোর্ড দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ঘটনার পর থেকে বিসিবি নাঈম ও তার পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে এবং দোষী প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ঘটনায় জড়িত একজন এসআইসহ দুইজনকে পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

প্রশ্ন যেটি থেকে যায়

অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন লাখো মানুষ। সেই স্বপ্নের পক্ষে কথা বলেছিলেন নাঈম হাসানও। কিন্তু রাতের চট্টগ্রামে যা ঘটল, তা সেই স্বপ্নের বিপরীতে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—পোশাক পরিবর্তন হয়েছে কি, কিন্তু মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে কতটুকু?

যিনি ছাত্রদের সাহসকে 'ট্রিবিউট' জানিয়েছিলেন, তিনিই রাতের অন্ধকারে একই রকম রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হলেন। এটি কেবল একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয় — এটি একটি সিস্টেমের দর্পণ। নাঈমের চোখের জলের উত্তর খুঁজতে হবে সেই দর্পণের দিকে তাকিয়ে।

এমএইচ

শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী

কোম্পানীগঞ্জে অনুষ্ঠিত হলো উদয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা

পার্লামেন্ট থেকে সচিবালয়, সব জায়গায় হুতুমপেঁচা বসেছে

কিলিং মিশনে অংশ নেয় ৬ জন, দুজন মাথায় গুলি করে

মতলব উত্তরে মাদরাসা ছাত্র নিখোঁজ

ধর্ষণে অভিযুক্ত শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা বহিষ্কার

সীতাকুণ্ডে জামায়াত নেতার ইন্তেকালে আসলাম চৌধুরীর শোক

রাউজানে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা

রাঙ্গামাটিতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের পুনর্বাসনে নেই উদ্যোগ

কক্সবাজারে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মূল হোতা গ্রেপ্তার