রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন চট্টগ্রামে এসআরভি স্টেশনে ভূ-বরাদ্দ নীতিমালা অমান্য করে শতকোটি টাকা মূল্যের জায়গা বিনা টেন্ডারে বরাদ্দ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ রেলওয়ের বাণিজ্যিক শাখা, ভূ-সম্পত্তি দপ্তর ও নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের যোগসাজশে এই বরাদ্দটি দেওয়া হয়েছে বলে এই অভিযোগ রয়েছে। একে কেন্দ্র করে পুরো পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মচারী ও কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অনিয়ম রেলওয়ের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় গভীর অচলাবস্থা সৃষ্টি করছে।
আইন অনুযায়ী চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় রেলওয়ের কোনো জায়গা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিজ বা লাইসেন্স দিতে হলে মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদনের পর উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। এছাড়া রেলওয়ে ভূ-বরাদ্দ নীতিমালা-২০২০ অনুসারে শুধু প্রকৃত রেল ব্যবহারকারীরাই বিশেষ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বরাদ্দ পেতে পারে। সেটাও নির্দিষ্ট শর্ত ও যৌথ অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ধাপ পুরোপুরি পাশ কাটিয়েই এসআরভি (ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন এলাকায় স্থাপিত স্ট্যান্ড রোড ভিক্টোরিয়া) স্টেশনের চার হাজার ৫০০ বর্গফুট খোলা জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘উৎস ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ রেলওয়ের মালামাল পরিবহন বা মালামাল সংরক্ষণ-কোনোটার সঙ্গেই জড়িত নয়। ফলে নীতিমালার ৩১ ধারায় বর্ণিত কোনো শর্তই প্রতিষ্ঠানটি পূরণ করতে পারেনি। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের পহেলা জানুয়ারি এসআরভি স্টেশনের মোট ছয় হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দের আবেদন করলে সিসিএম (পূর্ব) দপ্তর কোনো টেন্ডার ছাড়াই চার হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গা তাদের অনুকূলে বরাদ্দ দিয়ে দেয়। পরে এই বরাদ্দ বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) চট্টগ্রাম দপ্তরে পাঠানো হয়।
ওই বছরের ২১ অক্টোবর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা তৌষিয়া আহমেদের স্বাক্ষরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লাইসেন্সধারী এসএমএ মোসাব্বিরের কাছে ২৭ লাখ টাকা লাইসেন্স ফি জমা দেওয়ার চিঠিও ইস্যু করা হয়।
এক কর্মকর্তার স্বাক্ষরে তদন্ত রিপোর্ট, অনুমোদনহীন নকশা
প্রাপ্ত নথিপত্র যাচাই করে আরো একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তদন্ত রিপোর্টে দেখা যায়, পুরো নথিতে কেবল বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। অথচ রেলওয়ে ভূ-বরাদ্দ নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে— এ ধরনের বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব), প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পূর্ব) এবং মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) এই তিন দপ্তরের যৌথ স্বাক্ষর ছাড়া কোনো নথি বৈধ গণ্য হবে না। কিন্তু নথির কোথাও তাদের স্বাক্ষর দেখা যায়নি। এছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নকশাটিও অনুমোদনহীন অবস্থায় সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের একজন প্রকৌশলী এ ঘটনাকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, নকশা জিএম বা প্রধান প্রকৌশলী ছাড়াই কীভাবে অনুমোদিত হলো, তা তদন্ত করলেই বড় চক্র বেরিয়ে আসবে। এ ধরনের নকশা কখনোই এককভাবে অনুমোদন হওয়ার কথা নয়।
রেলওয়ের আরো এক কর্মকর্তা বলেন, রিপোর্ট ও নকশায় স্বাক্ষর সংক্রান্ত অনিয়ম না হলে বরাদ্দ এগোতেই পারত না। বোঝাই যায়, পুরো ব্যাপারটি খুবই পরিকল্পিত। স্বাক্ষর দূরে থাক, অনেক নথি মূল অনুমোদন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে গোপনে সম্পন্ন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চলতি বছরের ৮ মার্চ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম বরাবর অভিযোগ দেন সেকান্দর মিয়া নামে একজন। অভিযোগে বলা হয়েছে, জায়গাটি আগে অন্য এক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ ছিল। কিন্তু তাকে কোনো লিখিত নোটিস না দিয়েই নতুন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ করে দেওয়া হয়। যে প্রক্রিয়া নীতিমালার সরাসরি পরিপন্থী।
আ.লীগের এমপির ঘনিষ্ঠদের তদবির
রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বাণিজ্যিক দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বরাদ্দ প্রক্রিয়ার পেছনে আওয়ামী লীগের এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সরাসরি তদবির ছিল। সেই তদবিরকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী—বিশেষ করে আরএনবি ও সিজিপিওয়াইয়ের কয়েকজন সদস্য সরাসরি অর্থ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসআরভি স্টেশনের আরএনবি ইনচার্জ হাবিলদার পঙ্কজ রায়, রেলওয়ে পণ্য খালাস ও পরিবহনের ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই)-এর হাবিলদার নমেশ চন্দ্র মজুমদার, স্টেশন মাস্টার সৈকত দেবনাথ এবং সিজিপিওয়াইয়ের কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বরাদ্দ সংক্রান্ত লেনদেনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
অভিযোগকারী সেকান্দর মিয়ার ভাষ্য, বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে এসব সদস্যের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং তাদের মাধ্যমে বরাদ্দের নথি অতি দ্রুত অগ্রসর করানো হয়। রেলওয়ের বাণিজ্যিক এলাকা থেকে মাসে বিপুল অঙ্কের অর্থ ওঠে—এ তথ্য জেনেই সিন্ডিকেটটি এই বরাদ্দকে লাভজনক সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকার পরও কীভাবে বরাদ্দটি গোপনে সম্পন্ন হলো তা নিয়ে এখন রেলওয়ের অভ্যন্তরে তীব্র আলোচনা চলছে।
সূত্রের দাবি, লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপে গিয়ে তারা মোট বরাদ্দ অর্থ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুষ আদায় করতেন। এসব টাকার একটি বড় অংশ প্রতি মাসে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো হতো। অভিযোগে আরো উল্লেখ আছে, এসআরভির আরএনবি ইনচার্জ পঙ্কজ রায় মাসে ৫০ হাজার টাকা আরএনবির চিফ কমান্ডেন্টকে দিতে বাধ্য থাকেন, আর সিজিপিওয়াইয়ের ইনচার্জ আবু সুফিয়ানকে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা।
রেলওয়ের নথিপত্র আরো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, পুরো বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অতি গোপনে সম্পন্ন করা হয়েছে। আবেদন জমা পড়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তদন্ত, নকশা, বরাদ্দ এবং লাইসেন্স প্রদান—এই চারটি ধাপ একসঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হয়েছে, যা সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া তদন্ত রিপোর্ট ছিল অসম্পূর্ণ, নকশাতেও অনুমোদনের সিল বা স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি, অথচ এসব নথি ছাড়া কোনো বরাদ্দ গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মটি হলো—এসব প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি।
ডিসিও দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, নিয়ম মেনে চললে এ ধরনের দ্রুত ও গোপনীয় বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার ভাষায়, এ ধরনের বরাদ্দ শতভাগ নীতিমালা-বহির্ভূত। এটা কোনো বিশেষ তদবির বা আর্থিক লেনদেন ছাড়া সম্ভব নয়।
এদিকে, এই বরাদ্দকে কেন্দ্র করে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের আধিপত্যের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে।
এই বিষয়ে জানতে ২৪ ও ২৫ মার্চ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক আতাউল হক ভুঁঞা, প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ও প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তাকে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠিয়ে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কোনো উত্তর দেননি।
তবে রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। কোনো অনিয়ম আমরা বরদাস্ত করব না। ভূমি বরাদ্দে অনিয়ম হয়ে থাকলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।