গতি হারাচ্ছে বে, মাতারবাড়ি, গ্রিনফিল্ড
এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি’র মতো চলমান রেডি টার্মিনালের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। শুরুতে মাতারবাড়ি, বে-টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনালের মতো গ্রিনফিল্ড টার্মিনালে বিনিয়োগ করার কথা বলে বাংলাদেশে এলেও এখন তাদের নজর চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালগুলোর দিকে। ইতোমধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড, এপি মুলার মার্স্ক বা মার্স্ক লাইনসহ একাধিক গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটররা এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবির দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়।
এতদিন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দেশীয় বিভিন্ন অপারেটর প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে টার্মিনালগুলো পরিচালনা করত বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রেডি টার্মিনালের দিকে ঝুঁকে পড়ায় মাতারবাড়ি, বে টার্মিনাল ও লালদিয়ার চর টার্মিনালের গতি কমে গেছে। এতে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ঝুলে গেছে।
বন্দর সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন কাট্টলী এলাকায় বে টার্মিনাল নামের নতুন বন্দর তৈরির উদ্যোগ নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। জায়গা নির্ধারণ, ভূমি অধিগ্রহণসহ বেশকিছু কাজ এগোলেও ৯ বছরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এখন পর্যন্ত ড্রয়িং, ডিজাইনের মতো দাফতরিক কাজেই সীমাবদ্ধ বড় এই প্রকল্প। প্রাথমিকভাবে বড় এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক সহায়তা হিসেবে দেবে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। বাকি প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে চট্টগ্রাম বন্দর নিজেই।
সম্ভাবনাময় আরেকটি প্রকল্প হলো কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প। ইতোমধ্যে সেখানে অবস্থিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কৃত্রিম চ্যানেল ও ব্রেক ওয়াটার তৈরি করা হয়েছে। এই চ্যানেল আর ব্রেক ওয়াটার ব্যবহার করেই মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে জমি বরাদ্দ ও অধিগ্রহণ হয়ে গেছে। জেটি-টার্মিনাল-শেড এবং ইয়ার্ড তৈরি হলেই অপারেশনে আসবে বন্দরের কার্যক্রম। চ্যানেল ও ব্রেক ওয়াটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হলেও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে চলছে ধীরগতি। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দুই হাজার ৬৭১ কোটি আর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দুই হাজার ২১৩ কোটি টাকার যোগান দেবে। বাকি টাকা বিনিয়োগ করবে জাপানের জাইকা। তবে টাকার যোগান হলেও গতি নেই কাজে।
অন্তর্বর্তী সরকার আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী মোহনার কাছে পতেঙ্গায় ৫০ একর জায়গার উপর টার্মিনাল নির্মাণ এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ চুক্তি চূড়ান্ত হয় বিশ্বখ্যাত শিপিং প্রতিষ্ঠান মার্কস লাইনের এপি মুলার-এর সঙ্গে। চুক্তির পর ছয় মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও গতি আসেনি নতুন টার্মিনাল তৈরির কাজে।
অথচ কয়েক বছর ধরে বে টার্মিনালে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে সিঙ্গাপুরের সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটি, দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। একইভাবে মাতারবাড়িতে রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই চট্টগ্রাম বন্দরের অত্যাধুনিক কন্টেইনার টার্মিনাল এনসিটির পাশাপাশি সিসিটিটি পরিচালনাতেই বেশি আগ্রহী। গত কয়েক বছর ধরে এনসিটিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা নিয়ে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীসহ বন্দর ব্যবহারকারীরাও অন্দোলনে নেমেছে। সম্প্রতি এনসিটির পাশাপাশি চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল সিসিটিও সমন্বিতভাবে পরিচালনার প্রস্তাব দিয়ে বসেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল বা পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে। গত দুই বছর ধরে কর্ণফুলী মোহনায় অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনালটি পরিচালনা করলেও লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। বছরে পাঁচ লাখ টিইইউ কন্টেইনার ওঠা-নামা করার কথা থাকলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে এক লাখ ৪৩ হাজার কন্টেইনার ওঠা-নামা করেছে। এর মধ্যে ৩১ শতাংশই খালি কন্টেইনার। এরপরও নতুন করে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে রেড সি গেইটওয়ে। এই প্রতিযোগিতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড, রেড সী-এর সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ ও সাইফ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বার্থ অপারেটরদের একটি কনসোর্টিয়ামও এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি পরিচালনার দায়িত্ব নিতে মরিয়া।
বন্দর বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম জানান, গ্রিনফিল্ড পোর্টের মধ্যে বে টার্মিনালের গতি সবচেয়ে কম। যখন এই টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তখন ২০২৫ সালের মধ্যে এটাকে অপারেশনে আনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ২৬ সালেও সেটার কাজই শুরু করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় লাভ খুঁজবে। আর এই কারণেই গ্রিনফিল্ড পোর্টের চেয়ে রেডি টার্মিনালের দিকে তাদের আগ্রহ বেশি। এটাই স্বাভাবিক। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো বন্দর কী চাচ্ছে। এনসিটি, সিসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দিলে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং হয়তো কিছুটা বাড়বে। কিন্তু তাতে তো বড় জাহাজ চ্যানেলে আসবে না। বড় জাহাজ ভেড়াতে গেলে বে-টার্মিনালের বিকল্প নেই। রেডি পোর্টের দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ বাড়ার ঘটনাটি ব্যতিক্রম। বন্দরের উচিত বিনিয়োগকারীদের রেডি টার্মিনালে নিরুৎসাহিত করে গ্রিনফিল্ড টার্মিনালের দিকে ঠেলে দেওয়া।
চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য মেরিন কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ জানান, লালদিয়া ২০২৯, বে টার্মিনাল ২০৩০ ও মাতারবাড়ি বন্দর ২০৩০ সালে অপারেশনে আনার টার্গেট নিয়ে কাজ চলছে। এনসিটি, সিসিটি, জিসিবিতে বিদেশি অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে কারণ এই টার্মিনালগুলো আমরা ভালোভাবে চালাচ্ছি। এখানে আগ্রহ দেখানোর কারণে গ্রিনফিল্ড টার্মিনালগুলো বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এটা ঠিক নয়। কারণ এক একটি টার্মিনাল ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বাস্তবায়ন হবে। একটার সঙ্গে অন্যটার কোনো সম্পর্ক নেই। ব্যবসায়ীরা যেখানে কম বিনিয়োগে লাভ বেশি দেখবে সেখানে আসতে আগ্রহী হবে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সচেতন আছে। বন্দরের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করবে না।