ফের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় সন্ত্রাসীরা
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর স্থাপিত দুটি ক্যাম্পে নানামুখী সংকটে পড়েছেন সেখানে দায়িত্বরত ২০০ জন পুলিশ ও র্যাব সদস্য। গত ২৩ দিন ধরে নিরাপদ খাবার পানি, বিদ্যুৎ ও উপযুক্ত খাবার সংকটে ভুগছেন তারা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। শুধু তাই নয়, প্রশাসনকে দুর্বল করতে রাতের আঁধারে পানির সংযোগ কয়েক দফায় বিচ্ছিন্ন করে দেয় সন্ত্রাসীরা। এতে আরও ভোগান্তিতে পড়েন পুলিশ সদস্যরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পর আবারও ধীরে ধীরে সংগঠিত হচ্ছে সন্ত্রাসীরা। ফের পাহাড়ে চাঁদাবাজি, পাহাড় কেটে প্লট ব্যবসা, পরিবহন ও অবৈধ বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ন্ত্রণসহ নানারকম বাণিজ্যের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় কৌশলে সেখানে আসা-যাওয়া অব্যাহত রেখেছেন সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৯ মার্চ আইনশৃঙ্খলা চার হাজার সদস্য নিয়ে আইনশষৃঙ্খলা বাহিনীর বড় ধরনের অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর ছেড়ে গেছে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনও বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে ওই এলাকায় তার ঘনিষ্টরা নিয়মিত যাতায়াত করছে। এরমধ্যে ইয়াছিনের ঘনিষ্ট কাজী ফারুক, মো. হাছান, জামাই ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারি, ওমর ফারুক, আল আমিন, বেলাল, বিপ্লব, নুর হোসেন, শুক্কুর, শাহিন ফকির অন্যতম।
তারা ঈদুল ফিতরের দিন ও পরের কয়েক দিন র্যাব হত্যা মামলার আসামি হয়েও এলাকায় ঘুরেছেন, গিয়েছেন পরিবারের কাছেও। গত শুক্রবার ইয়াছিনের দুই সহযোগী দেলোয়ার ও মো. সোহেল আলীনগর থেকে নগরীতে আসার পথে তাদেরকে আটক করে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা।
এদিকে পুলিশের কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে জানান, প্রতিনিয়ত নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে জঙ্গল সলিমপুরের ক্যাম্পে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে মোবাইলে ঠিকভাবে চার্জ করা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে পরিবারও তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কখনও গরম, কখনও ঠান্ডা অনূভূত হচ্ছে সেখানে। তাঁবুতে রাত্রীযাপনে দুর্বিষহ ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। এছাড়াও প্রতিদিন পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলো থেকে খাবার পানি আনতে হচ্ছে। ভালো মানের হোটেল না থাকায় খাওয়া-দাওয়া, গোলস, স্যানিটেশনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতেও পারছেন না তারা।
অপরদিকে সংশ্লিষ্টরা জানান, র্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব হত্যা মামলার ২৯ জন এজাহারনামীয় আসামির মধ্যে এখনও বেশিরভাগ আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করলেও এজাহারনামীয় মূল আসামিরা অধরা। হত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী ইয়াছিন ও তার সহযোগীরাও এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।
সূত্র জানায়, গত ৯ মার্চ থেকে ওই এলাকায় অস্থায়ী দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত আছেন পুলিশ ও র্যাবের ২০০ জন সদস্য। কিন্তু এসব সদস্য ও কর্মকর্তাদের এলাকাটির ভৌগলিক অবস্থান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোর সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। এতে সন্ত্রাসীরা অনায়াসেই নিয়মিত যাতায়াত করতে পারছেন সেখানে। এছাড়া্ও র্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব হত্যা মামলার প্রধানি আসামি ইয়াছিনের গ্রুপের অনেক সদস্য প্রশাসনের কাছে অপরিচিত। কেউ সিএনজিচালক বেশে, কেউবা সবিজওয়ালা বেশে এলাকায় ঘুরে প্রশাসনকে নজরদারি করছে। এতে প্রশাসনের মুভমেন্ট তারা টের পাচ্ছেন। এছাড়া আগের ঘটনাগুলোতে পুলিশ ও র্যাবের সোর্সকে টার্গেট করে মারধর, সাামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষোদগার ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় বর্তমানে অনেকেই ভয়ে পুলিশের হয়ে কাজ করছে না। এতে তথ্য সংগ্রহে বেকায়দায় পড়েছে প্রশাসন।
সেখানকার বাসিন্দাদের আশঙ্কা এই অবস্থা চলতে থাকলে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে যেকোন সময় আধিপত্য বিস্তার করতে পারে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। যদিও বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা, আলীনগরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কয়েকটি নুরানী মাদ্রাসা খোলা রয়েছে। এছাড়াও হাট-বাজার, মার্কেটে নির্ভিঘ্নে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। স্থানীয়রা অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, দুটি ক্যাম্পে র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা পানি, বিদ্যুৎ, খাবার সংকটে আছেন। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করতে। দুর্গম এলাকা হওয়াতে সেখানে কোনো কিছু পৌঁছানোও কষ্টের। তবে জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে সব সমস্যার সমাধান করা হবে।
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে পরিচালিত ক্যাম্প দুটি পরিদর্শন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল মো. হাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, আলীনগর ও জঙ্গল সলিমপুরে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্পে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের সমস্যা সমধানে শীঘ্রই উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে পানির সংকট কাটাতে দুটি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের জন্য স্থায়ীভাবে টিনের ছালের ঘর নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে পাহাড় কাটা, পরিবেশ ধ্বংসসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে। তারা এলাকাটিকে কার্যত সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। এমনকি তারা একজন র্যাব অফিসারকেও হত্যা করে। গত ৯ মার্চ র্যাব, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রায় চার হাজার সদস্যের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। বাহিনীগুলোর সমন্বিত দক্ষতায় কোনো প্রাণহানি ছাড়াই সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনঃনিয়ন্ত্রণে এসেছে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি এক অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা র্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেবকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় ২৯ জনকে আসামি একটি মামলা করা হয়। গত ৯ মার্চ সেখানে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করে ২২ জনকে গ্রেপ্তার ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করে যৌথবাহিনী।