চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় সাড়ে তিন বছরের একটি নিরীহ শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় গাড়িতে আগুন দেওয়া, এক উপ-পুলিশ কমিশনারের ওপর হামলা এবং অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার রাতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ বলছে, এই গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা শুধু সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁরা ওই এলাকার আলোচিত ধর্ষণ মামলার আসামিকে ‘সরকারকে বিব্রত করা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নষ্ট করার উদ্দেশ্যে’ পিটিয়ে হত্যার পরিকল্পনাও করেছিলেন। সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করেছে পুলিশ-এমনটাই দাবি তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাকলিয়া থানার ওসি মো. সোলাইমান। তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে দেখে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারা ধর্ষণকাণ্ডের পর অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছিল।
গত ২১ মে সাড়ে ৩ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে স্থানীয় ডেকোরেশন কর্মচারী মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে। ওইদিন গোটা এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওইদিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের একটি গাড়িতে।
বাকলিয়া চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও। ওই সড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় লোকজন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।
সহিংস পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামে। গ্রেপ্তারকৃত মনির হোসেনকে বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে রক্ষা করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর রাত থেকেই পুলিশ, ডিবি ও র্যাব যৌথভাবে অভিযান শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করা হয়। সোমবার (২৫ মে) রাতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালিয়ে মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ১১ জনের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা অভিযোগ রয়েছে। চারজনের বিরুদ্ধে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ, ২ জনের বিরুদ্ধে উপ-পুলিশ কমিশনারের ওপর সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ এবং বাকিদের বিরুদ্ধে সামগ্রিক নাশকতা ও পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বাকিরা স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার ছিন্নমূল তরুণ।
চাঞ্চল্যকর তথ্য: আসামিকে হত্যার ছক
জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কেবল সহিংসতায় অংশ নেননি, বরং ধর্ষণ মামলার অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আদালতে তোলার সময় অথবা পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন আক্রমণ করে পিটিয়ে হত্যার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেছিলেন তারা।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো গেলে এলাকায় আরও বড় অস্থিরতা তৈরি হতো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে 'দুর্বল ও ব্যর্থ' হিসেবে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করা যেত। এটি ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "দ্রুত গ্রেপ্তার ও মোতায়েন না করলে পরিস্থিতি অন্যখানে চলে যেত। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এটি ছিল পরিকল্পিত।"
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে এই ঘটনায় পৃথক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযোগ আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সহিংসতার পেছনে আরও ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্তের কাজ চলছে। ভুক্তভোগী পরিবারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।