করপোরেট ব্যবসায়ীদের দাপটে
করপোরেট ব্যবসায়ীদের দাপটে অবস্থানের কারণে বন্ধ হতে চলেছে চাঁদপুরের ১৮ রাইস মিল। ইতোমধ্যে তিন মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ১৫ মিল থেমে থেমে চলছে। রাইস মিল মালিকদের দাবি, করপোরেট ব্যবসায়ীদের দাপট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং পর্যাপ্ত ধানের অভাবে মিলগুলো এক এক করে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মিল মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ইতোমধ্যে চাঁদপুরের প্রতিষ্ঠিত এবং পুরোনো তিন রাইস মিল মক্কা অটো রাইস, তপাদার অটো রাইস মিল এবং বাবা অটো রাইস মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে মক্কা অটো রাইস মিলের মেশিনারিস নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে মঞ্জিল অটো রাইস মিল, রূপালী অটো রাইস মিল, শামীমা রাইস মিল, আজমিরি রাইস মিল, চাঁদপুর অটো রাইস মিল, মেঘনা অটো রাইস মিল এবং নিউ পূবালী রাইস মিল। মোটামুটি চলছে খাজা বাবা, বিসমিল্লাহ এবং রওশন রাইস মিল। চাঁদপুর জেলা রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম সরকার বলেন, এক সময় আমাদের এসব রাইস মিলের মাধ্যমেই ব্যবসায়ী এবং ভোক্তারা চাল সংগ্রহ করতেন। চাঁদপুর থেকে চাল সংগ্রহ করত দক্ষিণ অঞ্চলের অনেক জেলা। অথচ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নানা কৌশল এবং আর্থিক দাপটের কারণে জেলা পর্যায়ে রাইস মিলগুলো ক্রমান্বয়ে বন্ধের উপক্রম হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের নামকরা সিটি, মেঘনা, বসুন্ধরা, ফুয়াদ, প্রাণ এবং মজুমদার নামের বেশ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান দেশ এবং বিদেশ থেকে ধান সংগ্রহ করে উন্নত প্রযুক্তির মেশিনের মাধ্যমে চালের বাজার দখল করে নিয়েছে। ফলে আমরা ধীরে ধীরে মার্কেট হারাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, সারা দেশে আগে ৮০ কেজি ওজনের ধান এবং চালের বস্তা ক্রয়-বিক্রয় হতো। বর্তমানে এসব কোম্পানি এক কেজি থেকে শুরু করে ৫০ কেজি পর্যন্ত একাধিক ওজনের প্যাকেজিং প্রক্রিয়া চালু করেছে। ফলে, মানুষ তার চাহিদা অনুযায়ী ১ কেজি, ২ কেজি, ৫ কেজি, ১০ কেজি কিংবা ২০-২৫ কেজি হারে তাদের সুবিধামতো চাল কিনতে পারছে।
অথচ আমাদের মিলগুলোতে ৮০ কেজি থেকে সরে এসে এখন ৫০ এবং ২৫ কেজির প্যাকেটেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাছাড়া বড় বড় কোম্পানিগুলো সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ (এসআরের) মাধ্যমে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাজার দখল করে নিয়েছে। অথচ আমরা আর্থিক দৈন্যতার কারণে সে ধরনের প্রক্রিয়ায় যেতে পারছি না। ফলে আমাদের মিলের মালগুলো বাজারে তেমন একটা বিক্রি হচ্ছে না।
রাইস মিল ব্যবসায়ী বাহার চৌধুরীর দাবি, চাঁদপুরে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হয় না। ফলে আমরা সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান ক্রয় করে আনছি। ইদানীং করপোরেট ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা বাজার থেকে চাহিদামতো ধান ক্রয় করতে পারি না।
ফলে আমাদের মিলগুলো পর্যাপ্ত ধানের অভাবে প্রায় সময় বন্ধ থাকে। তাছাড়া ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আমাদের চাল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া প্রতিটি মিল ক্রাশারের ওপর নির্ভরশীল। অথচ সেই ক্রাশারিদের এখন আর সময়মতো পাওয়া যায় না। ফলে আমাদের উৎপাদন দিন দিন কমতে শুরু করেছে।
আজমিরি রাইস মিলের মালিক মাইনুল ইসলাম কিশোর বলেন, আমাদের মিলগুলো ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় প্রতিটি মিল মালিক ব্যাংক ঋণে জর্জরিত হয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে। পাশাপাশি কর্মহীন হতে যাচ্ছে, প্রতিটি মিলে কাজ করা প্রায় দুই হাজার কর্মচারী।
সরকারের কাছে মিল মালিকদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাদেরকে আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে এবং করপোরেট ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনতে হবে। নইলে অল্প সময়ের মধ্যে চাঁদপুরের সব রাইস মিল মালিকরা পথে বসে যাবে।
এএস