ফেসবুকে সমালোচনার ঝড়
জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন যুবলীগ নেতা ও সন্ত্রাসী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। তারই সহযোগী মোহাম্মদ আবু আবিদকে সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র (গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়া) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
১৫ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সাইফ উদ্দিন গিয়াস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। খবরটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
বাবরের মিডিয়া ম্যানেজার থেকে সরকারি মুখপাত্র আবু আবিদ দীর্ঘদিন ধরে হেলাল আকবর বাবরের ঘনিষ্ঠ মিডিয়া সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন। বাবরের হয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখা, ফেসবুক লাইভ প্রচার, প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন, এমনকি ‘সামাজিক সংগঠন’ ব্যানারে প্রোপাগান্ডা চালানো। সবকিছুতেই ছিল তার সরব উপস্থিতি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সাবেক ছাত্রনেতারা জানান, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মুরাদপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার দিনও বাবরের আশপাশে সক্রিয়ভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন আবিদ। বাবরের নির্দেশনা ভিডিও ধারণ, অনুসারীদের মধ্যে বার্তা পৌঁছে দেয়া এবং ঘটনার ‘মিডিয়া কাভারেজ’ নিশ্চিত করাসহ নানা কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা গেছে।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, হামলার পরদিন বাবরের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে ‘প্রতিক্রিয়া’ ও ‘বিজয় উদযাপন’ দেখানোর যে প্রচারণা চালানো হয়েছিল, তা সমন্বয় করেন আবু আবিদ।
‘সামাজিক সংগঠন’ এর আড়ালে চলত তার প্রোপাগান্ডা। বাবরের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি তথাকথিত ‘সামাজিক সংগঠন’-এর হয়ে গণমাধ্যমে মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন আবিদ। সেই সংগঠনের নাম ব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের ফোন করতেন, বিবৃতি পাঠাতেন এবং বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
সংগঠনের আড়ালে মূলত বাবরের ‘ইমেজ ম্যানেজমেন্ট’ ও রাজনৈতিক অবস্থান জোরালো করার প্রচারেই যুক্ত ছিলেন আবিদ।
সূত্র জানায়, সাংবাদিকদের প্রভাবিত করার জন্য ফোন করে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হওয়ায় প্রশাসন ও সাংবাদিক মহল বিস্মিত। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নিয়োগ দেওয়ায় বিস্মিত প্রশাসনিক ও সাংবাদিক মহল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, ‘ছাত্র আন্দোলনের সময় যে ব্যক্তি একজন অভিযুক্ত সন্ত্রাসীর মিডিয়া সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল, তাকে মুখপাত্র বানানো সরকার প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।’
একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে একাধিক মানবাধিকার সংস্থা ও ছাত্র সংগঠন। তাদের ভাষায়, এই নিয়োগ শুধুই প্রশাসনের দলীয়ীকরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের সহিংসতায় জড়িতদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর বার্তা, দলীয় আনুগত্য থাকলে সব কিছুই মাফ।
আবু আবিদের নিয়োগ নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। রাইহান মাহমুদ নামে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, যে ব্যক্তি ছাত্র হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্তের মিডিয়া মুখপাত্র ছিল, সে আজ সরকারের মুখপাত্র! হত্যাকারীর মুখপাত্র এখন রাষ্ট্রের মুখপাত্র! এ লজ্জা রাখি কোথায়?
সাংবাদিক মনসুর নবী ফেসবুকে লিখেছেন, আজ থেকে বিএনপির নির্বাচন চায়া নিয়ে আর কোনো ট্রল করবো না, শপথ করলাম। বাবরের সহযোগী একজন ভুয়া সাংবাদিক যদি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হতে পারে, তাহলে এই এন্টেরিম সরকারের উদ্দেশ্য ও বিধেয় নিয়ে বিএনপির সন্দেহ পুরোপুরি সঠিক। এরা কি সত্যিই কোনো সংস্কার করবে? এন্টেরিমের হেডাম আমাদের চেনা হয়ে গেছে। দ্রুত নির্বাচন দিন এবং গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ বলেন, যুবলীগের সন্ত্রাসী বাবরের সহযোগী কীভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পদ পায়। দ্রুত তাকে সরাতে হবে। সঙ্গে, তাকে যারা এই পদে বসিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবু আবিদকে ফোন করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
এমএস