টানা ছয় বছর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে নাজির পদে ছিলেন জামাল উদ্দিন। এ ছয় বছরে বনে যান অঢেল সম্পদের মালিক। এ নিয়ে ‘৩০ হাজার টাকার বেতনে দেড় কোটির ফ্ল্যাটে চট্টগ্রামের নাজির জামাল’ শিরোনামে আমার দেশ অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে নোয়াখালীতে বদলি করা হয়। গেল বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখা এ সংক্রান্ত এক আদেশ জারি করা হয়।
বদলির আদেশে সই করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সাধারণ) মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী। জামাল উদ্দিন ছাড়াও আরো দু’জন কর্মচারিকে বদলি করা হয়।
জেলা প্রশাসনের সার্টিফিকেট শাখার উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাশকে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এবং চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন চৌধুরীকে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নাজির থেকে তাকে বদলি করা হয় নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। কিন্তু চারমাস যেতে না যেতেই ফের জামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে বদলি হয়ে এসেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের আমলে ব্যাপক দাপুটে রাজত্ব করেছেন জামাল উদ্দিন। আওয়ামী লীগের দুই মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার কথায় যেন অলিখিত আইন ছিল। নানা দুর্নীতির অভিযোগে ছয় বছর পর তাকে বদলি করা হয় নোয়াখালীতে। নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই জামাল আবারও জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে বদলি হয়ে এসেছেন।
জেলা প্রশাসন তথ্য ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৫ সালে জেলা প্রশাসনে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে যোগ দিয়ে চাকরি শুরু করেন তিনি। আর দুই দশকে জামাল এখন সম্পদের কামাল। নগরের কোর্ট রোড় এলাকায় কেসি দে গ্রাণ্ড ক্যাসেল ভবনের চতুর্থ তলায় দুই হাজার ৬৫ বর্গফুটের ফোর সি ও ফোর ডি দুটি ফ্ল্যাটে থাকেন জামাল ও তার পরিবার। যার বর্তমানে মূল্য দেড় কোটির বেশি। তবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি ৮৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকায় ফ্ল্যাট দুটে ডেভেলফমেন্ট কোম্পানি ডি ডেভেলফমেন্ট থেকে কেনেন বলে জানা গেছে।
অফিস সহকারী হিসেবে চাকরিতে ঢুকলেও বিভিন্ন ভূমি অফিস ঘুরে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর জামাল জেলা নাজিরের পদ ভাগিয়ে নেন। এই পদে নিতে তার বিরুদ্ধে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও জৈষ্ঠ্যতা লঙ্গনের অভিযোগ আছে। অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের কাছে জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা একটি অভিযোগ দিয়েছেন যে দীর্ঘদিন ধরে তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকে ১৫-১৬ বছর ধরে পছন্দের পদে পছন্দের অফিসে ছিলেন। অবশেষে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিনের সততা ও নিরপেক্ষতার কারণে এসব অভিযুক্ত কর্মচারীদের দীর্ঘদিন পর বদলি করার সুযোগ হয়েছে। এতে খুশি হয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মূলত নাজির পদেই বসেই সম্পদের মালিক হতে শুরু করেন তিনি। সম্প্রতি দুদকেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়েছে। এরআগে দুদক হিসেব চাইলে জামাল উদ্দিন বহু সম্পদ গোপন করে মাত্র ১৩ লাখ ৭৬ হাজার স্থাবর ও ২২ লাখ ৮৬ হাজার অস্থাবর সম্পদের হিসাব দেয়। তার স্ত্রী রুনা আক্তারের মাত্র ৫৫ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব দেন। তবে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪ এ জামালের আয়কর রিটার্ন অনুসারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র অর্ধকোটির সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেন। বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় তিনি আত্মীয় স্বজনদের নামে বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। বাস্তবে তার সম্পদের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি।
তবে চার মাস পর নোয়াখালী থেকে পুরোনো কর্মস্থল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনে বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন বলেন, জামালের চাকরি ছিল চট্টগ্রাম জেলা ভিত্তিক। সরকার চাইলে সাময়িকভাবে অন্য জেলা বা বিভাগে সংযুক্তি করতে পারে। মাঝখানে তাকে অফিশিয়ালি নোয়াখালীতে সংযুক্তি দেয়া হয়েছিল। বেতন চট্টগ্রাম থেকে হত। এখন জামালের সংযুক্তি প্রত্যাহার করা হয়েছে।