কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকটে ভুগছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা। লোকবল সংকট ও রোগীর চাপে হাসপাতালটি যেন নিজেই রোগীতে পরিণত হয়েছে। কোনোমতে খুঁড়িয়ে চলছে নিকলীবাসীর একমাত্র ভরসার এই ৫০ শয্যার হাসপাতাল।
সরেজমিনে জানা যায়, হাসপাতালটিতে ১৭ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। আরও জানা যায়, চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ মোট ৩২টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ১টি, মেডিকেল অফিসার ২টি, সিনিয়র স্টাফ নার্স ৪টি, ফার্মাসিস্ট ২টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) ২টি, প্রধান সহকারী ১টি, গাড়িচালক ১টি, ওয়ার্ড বয় ৩টি, আয়া ২টি, নিরাপত্তা প্রহরী ১টি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ৩টি, মালি ১টি, অফিস সহায়ক ১টি পদে লোকবল রয়েছে। ল্যাব অ্যাটেনডেন্টের পদ শূন্য, আর কুক/মসলাবিটে আছেন ১ জন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই ভঙ্গুর অবস্থার কারণে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে জেলা সদরের হাসপাতালগুলোতে। এতে বিশেষ করে শিশু ও নারী রোগী এবং উপজেলার ভাঙনকবলিত, অবহেলিত সিংপুর ও ছাতিরচর ইউনিয়নের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ছোট একটি কক্ষে কাটা-সেলাইসহ জরুরি চিকিৎসা চলছে। প্রায় সবসময়ই জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ থাকে, যা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি বিভাগের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের দাবি জানিয়েছেন পরী সাহাসহ চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
বহিঃবিভাগে দেখা যায়, চেম্বারে রোগী দেখছেন স্টাফ নার্স। তারা ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখে দিচ্ছেন। চেম্বারের বাইরে দীর্ঘ সারিতে রোগীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অন্যদিকে, বিভিন্ন চেম্বারে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা (সাকমু) সেবা দিচ্ছেন। কিন্তু চিকিৎসক সংকট রয়ে গেছে।
বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ইঞ্জিনিয়ার নাঈম হোসেন খান জানান, পায়ের গোড়ালির ব্যথার জন্য চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসক না থাকায় হতাশ হয়ে জেলা সদরের হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়েছেন। একই অভিযোগ করেন রোগী মীর আলী, আয়শা ও মাহমূদ—তারা জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, স্টাফ নার্সই সেবা দেন।
ইনডোরে চিকিৎসা নিতে আসা ধারীশ্বর গ্রামের পান্না বেগম (৪৫) জানান, মহিলা ওয়ার্ডের টয়লেটের দরজায় খিল না থাকায় ভয়ে টয়লেটে যেতে হয়—যে কেউ বাইরে থেকে দরজা খুলে দিতে পারে।
নিকলী সদরের রাইসুল হাসান জানান, তার বাবার বুকে ব্যথা হলে চিকিৎসক ইসিজি করতে বলেন। নতুন ভবনের ইসিজি রুমে গেলে জানানো হয়—“জেল সংকট আছে।” পরে জেল ছাড়াই ইসিজি করা হয়। এতে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “৫০ শয্যার হাসপাতালের এ রকম করুণ দশা কাম্য নয়।”
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রায় ১৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার সেবা। অবেদনবিদ ডা. মোজাম্মেল হোসেন এবং স্ত্রী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. সেলিনা হক ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বদলি হয়ে যাওয়ার পর থেকেই পদ দুটি শূন্য পড়ে আছে। একই বছরের ১০ আগস্ট থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি সিজারিয়ান অপারেশন হয়। এরপর আর কোনো অস্ত্রোপচার হয়নি। বর্তমানে লাখ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি অযত্নে পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সোহাগ মিয়া জানান, চিকিৎসক সংকটের কারণে বহিঃবিভাগে স্টাফ নার্স ও সাকমুরা প্রাথমিক সেবা দেন। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে জরুরি বিভাগে ডাক্তারের শরাণাপন্ন হতে বলা হয়। জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তার থাকেন। রাতে একজন চিকিৎসক জরুরি বিভাগে এবং একজন ইনডোরে দায়িত্বে থাকেন। কম লোকবল নিয়ে সেবা পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার–পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সজীব ঘোষ জানান, বদলিজনিত কারণে চিকিৎসক সংকট তৈরি হয়েছে। সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। মাত্র তিনজন চিকিৎসক দিয়ে জরুরি বিভাগ ও ইনডোর সার্বক্ষণিক চালু রাখা হচ্ছে। চিকিৎসক সংকটের কারণে বহিঃবিভাগ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে; নার্স ও সাকমুরাই সেবা চালাচ্ছেন।