বাজার নিয়ে আর কোনো দিনই ফিরে আসবে না, তা জুলাই শহীদ মো. জালাল উদ্দিনের শিশুসন্তানেরা এখন বুঝতে শুরু করেছে। তবে তার চলে যাওয়ার দুই বছর পরেও বাবার আসার পথ চেয়ে থাকে সিজান ও শিহাব।
শহীদ জালালের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকারের জারি করা সান্ধ্য আইন চলাকালে বাজার করতে গিয়ে ঢাকার মানিকনগর বিশ্বরোডে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জালাল উদ্দীন।
তিনি শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর থানার আনু সরকার কান্দি গ্রামের হতদরিদ্র মোহসেন রাঢ়ির চতুর্থ ছেলে । স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে মানিকনগরের বিশ্বরোড এলাকায় মিষ্টির ব্যবসা করতেন।
ওই এলাকাতেই ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে মো. সিজান (১৪)। বর্তমানে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। দ্বিতীয় ছেলে মো. শিহাব একটি মাদরাসায় পড়ে।
ভয়াল জুলাইয়ের স্মৃতি স্মরণ করে শহীদ জালালেরর বড় ছেলে সিজান জানায়, ‘বাবা আমাদের জন্য ঘরের বাজার করতে গিয়েছিলেন। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম বাবা বাজার নিয়ে আসবেন। আমরা খাব। কিন্তু সেই যে বাবা গেল, আজও এলো না। আমি জানি, বাবা আর কোনো দিনও আসবে না । সে কথা আমার ছোট ভাই কোনোমতেই বুঝতে চায় না। আমরা বাবা হত্যার বিচার চাই। আমি যেন পড়ালেখা করে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি, তার জন্য আপনাদের দোয়া ও সহযোগিতা চাই ।’
সে জানায়, ভর্তি ফি দিতে না পারায় তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানিকনগর আইডিয়াল স্কুল সেভেন ক্লাসে তার ভর্তি নেয়নি।
শহীদ জালাল উদ্দিনের স্ত্রী মিলি আক্তার বলেন, ‘ঘটনার দিন ২০২৪ সালের ২০ জুন দুপুরে আমাদের ঘরে বাজার ছিল না। ঘরের জন্য বাজার আর দোকানের অবস্থা দেখার জন্য বের হয়ে বিশ্বরোডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় সে। এরপর হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে পরদিন ২১ জুলাই তার নিজ গ্রাম ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর আনন্দবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়।
তখন বিভিন্নজন, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমাদের কিছু আর্থিক সহায়তা করেছে। সরকারিভাবে ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। এরপর তেমন আর কেউ আমাদের খোঁজ রাখেনি। গত কোরবানি ঈদে জামায়াতে ইসলামির পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা সহায়তা দিয়েছে। আমার ছোট ছেলেটাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি।
বিন্তু বড় ছেলেটাকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি ফির জন্য স্কুলে ভর্তি করতে পারছি না। জুলইযোদ্ধাদের সন্তানদের বেতন ফ্রি হলেও ভর্তি ফি ছাড়া ভর্তি নিচ্ছে না। আমার স্বামী যখন ছিল, তখন আমাদের অভাব-অনটন বলতে কিছু ছিল না। আমরা সুখেই ছিলাম। এখন গ্রামে শ্বশুর মারা যাওয়ায় শাশুড়ির দেখাশোনাও আমার করতে হয়।
আমি একটি বেসরকারি হাসপাতালে সামান্য বেতনে কাজ করি। দুই সন্তান আর শাশুড়িকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। আমি যা হারিয়েছি, তা কোনো দিনই ফিরে পাব না। তবে সরকার যদি শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের জন্য নিয়মিত মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করত, তাহলে আমিও আমার সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতে পারতাম।’
সখীপুর থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রাজিব সরদার বলেন, ‘মো. জালাল উদ্দিন আমাদের ইউনিয়নের আনু সরকার কান্দি গ্রামে ১৯৮৩ সালের ১০ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মোহছেন রাঢ়ী এবং মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। তিনি ঢাকায় ব্যবসাবাণিজ্য করে মোটামুটি ভালোই ছিলেন।
স্ত্রীর মোছা. মলি, দুই ছেলে সিজান ও শিহাবকে নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আমরাও কিছু করতে পারিনি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পুলিশের ভয়ে আত্মগোপনে ছিলাম। আমাদের দল ক্ষমতায় আছে, তাই আমরা তার ও তার পরিবারের জন্য কিছু করতে চাই। এ বিষয়ে আমাদের নেতা সংসদ সদস্য সফিকুর রহমান কিরনের সঙ্গে আলোচনা করেছি।’
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের উপজেলার দুজন জুলাই আন্দোলনে জীবন দিয়েছে। একজন হচ্ছেন সখীপুর ইউনিয়নের জালাল উদ্দীন, অপরজন ডিএমখালি ইউনিয়নের ইমাম হোসেন আকাশ। উভয়েই ঢাকায় শহীদ হন। তাদের পরিবার ঢাকাতেই অবস্থান করে। আমরা সব সময়ই তাদের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি। সরকারি কোনো অনুদান বা বরাদ্দ এলে তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।’
এমএইচ