নরসিংদী কারাগারে হামলার এক বছর
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদীর জেলখানার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পালিয়ে যায় ৮২৬ জন কয়েদি, যাদের মধ্যে ৭ জন সন্ত্রাসীও ছিল। হামলার সময় কারাগার থেকে লুট করা হয় ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮ হাজার ১৫টি গুলি ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ। তবে ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ধরা পড়েনি ১৪৮ জন পলাতক আসামি। এছাড়া উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ৩৪টি আগ্নেয়াস্ত্র। ফলে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জেলার সচেতন সমাজ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ওইদিন বিকাল সাড়ে চারটার দিকে একটি সংঘবদ্ধ হামলাকারী দল ইট-পাটকেল ছুড়তে ছুড়তে এবং দেয়াল টপকে কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় তারা পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে বিভিন্ন জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার সময় কারা কর্তৃপক্ষ ভেতর থেকে আটকানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে কারাগারের অফিস, রান্নাঘর, বন্দিদের থাকার জায়গা, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কনডেম সেলসহ পুরো এলাকা আগুনে পোড়ার চিহ্ন দেখা যায়। ঘটনার পরদিন ২০ জুলাই বিকেলেও কারাগারের ভেতরে কোথাও কোথাও আগুন জ্বলছিল।
এ ঘটনায় তৎকালীন জেলার কামরুল ইসলাম বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরপরই জেল সুপার আবুল কালাম আজাদ ও জেলার কামরুল ইসলামকে বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ। গঠন করা হয় তিনটি তদন্ত কমিটি— আইজি প্রিজন, সুরক্ষা সেবা বিভাগ ও জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে। তবে তদন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে এখনো গণমাধ্যমকে কিছু জানানো হয়নি।
ঘটনার পরপরই কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের স্থানীয় থানা, কারাগার ও আদালতের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেকে সে সময় আত্মসমর্পণ করলেও এখনো ১৪৮ জন আসামি ধরা পড়েনি। এছাড়া উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া ৩৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলি ও বিস্ফোরক।
ঘটনার পর ২১-২৪ জুলাইয়ের মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন তৎকালীন আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনিসুল হক, পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, র্যাবের মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্থানীয় এমপি লে. কর্নেল (অব.) মো. নজরুল ইসলামসহ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। এরপর পুনরায় কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
কারাগার ছাড়াও একই দিনে হামলা চালানো হয় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ইটাখোলা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি, মেহেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নরসিংদী জেলা পরিষদ ভবন এবং মাধবদী পৌরসভা কার্যালয়ে। সবগুলোতেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পরে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীরা বাইরে থাকায় জেলায় হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়ে গেছে।
এ ব্যাপারে জেল সুপার মো. শামীম ইকবাল বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমরাও বাইরে থাকা আসামি ও অস্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ তারা যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। তিনি বলেন, পোড়া কারাগার সচল করতে অনেক কাজ করতে হয়েছে। আপাতত প্রাথমিক মেরামতের পর কারাগার সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। আগামী বছর নতুন কারাগারে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদী পুলিশ সুপার মো. আব্দুল হান্নান বলেন, পলাতক আসামি ও অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যে কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব হবে।
সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত পলাতক কয়েদিদের গ্রেপ্তার ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করে জেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।