ছয় বছরেও শেষ হয়নি চার লেন
পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগে যে বিপ্লবের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার পূর্ণ সুফল এখনো পায়নি শরীয়তপুরবাসী। শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে পদ্মা সেতুর নাওডোবা প্রান্ত পর্যন্ত চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প ছয় বছরেও শেষ হয়নি। নির্ধারিত মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হলেও সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে কাজ বন্ধ, নির্মাণাধীন দুটি সেতুর কাজও ঝুলে আছে।
ফলে প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতু ও ভাঙাচোরা সড়ক দিয়েই ঢাকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও মাঠে নেই দুটি প্যাকেজের ঠিকাদার। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পেরে তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। তবে কবে নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে গেছে।
সওজ সূত্র জানায়, ২০২০ সালে শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ের নাওডোবা পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২১ সালে কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় ৩৪ ফুট প্রশস্ত আধুনিক সড়ক, দুটি নতুন সেতু এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও ছয় বছর পরও তা বাস্তবায়ন শেষ হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা ছিল। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ১ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮২ একর জমি অধিগ্রহণ শেষে সওজের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি জমি বুঝে না পাওয়ায় প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে কাজ শুরুই করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে ২৭ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে প্রায় ১৮ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু অবশিষ্ট প্রায় ৯ কিলোমিটার অংশ এখনো অসমাপ্ত। জেলা শহর থেকে জাজিরা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এবং জাজিরা টিঅ্যান্ডটি এলাকা থেকে নাওডোবা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার অংশে জমি জটিলতার কারণে কোনো নির্মাণকাজ হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মাণাধীন দুটি সেতুর অবস্থাও একই রকম। সদর উপজেলার কোটাপাড়া এলাকায় নতুন সেতু নির্মাণ শেষ হলেও অ্যাপ্রোচ সড়ক না থাকায় সেটি এখনো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে যানবাহনকে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতু দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। অন্যদিকে জাজিরার কাজীরহাট সেতুর কাজও আংশিক শেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে ওই এলাকাতেও সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও জনভোগান্তি।
মতিসাগর থেকে নাওডোবা পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে কালভার্ট নির্মাণকাজ চলমান থাকায় সড়কের অনেক অংশ সরু ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত, আবার কোথাও অসমাপ্ত অংশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। বর্ষাকালে এসব স্থানে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর শরীয়তপুর ছাড়াও মাদারীপুর, বরিশাল ও চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করে ঢাকায় যাতায়াত করছেন। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি এই পথে চলাচল করে। কিন্তু সড়কের অসমাপ্ত অংশের কারণে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট ও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে।
শরীয়তপুর-ঢাকা রুটের বাসচালক জাহাঙ্গীর খান বলেন, প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে ঢাকা যাই, আবার ফিরে আসি। পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর শরীয়তপুর অংশে গাড়ি চালানোই সবচেয়ে কষ্টকর। ভাঙাচোরা ও সরু সড়কের কারণে যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন, সময়ও অনেক বেশি লাগে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর শরীয়তপুরবাসী দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগের যে স্বপ্ন দেখেছিল, প্রকল্পের ধীরগতির কারণে সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। বরং অসমাপ্ত সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে প্রতিদিন দুর্ভোগই বাড়ছে।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন বলেন, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে কয়েকটি স্থানে জমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদাররা কাজ করতে পারেননি। দ্রুত জটিলতা নিরসনের চেষ্টা চলছে। তিনটি প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
এমএইচ