সবার নজর খুলনা-৫ আসনে
দুই হেভিওয়েটের লড়াইয়ে হাই ভোল্টেজ নির্বাচন হচ্ছে খুলনা-৫ আসনে। এ আসনের সাবেক এমপি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী। বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দি আলী আসগার লবি। তিনিও সাবেক এমপি, খুলনা সদর আসনে বেগম খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া আসনে উপ নির্বাচনে জিতেছিলেন প্রতিদ্বন্দিতাহীনভাবে।
শুরুতে লড়াইটা ভারসাম্যহীন মনে হলেও সময়ের সাথে সাথে এগিয়েছেন লবি। মুলত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে সমঝোতা ও হিন্দু ভোটারদেরকে কাছে টানতে পারাকে সফলতার কারণ মনে করছেন লবির অনুসারীরা। তবে এই কাজে বিপুল অংকের কালো টাকার ব্যবহার এবং সন্ত্রাসী সমাজ বিরোধীদেরকে কাজে লাগানোর অভিযোগ এসেছে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষ থেকে।
জানা গেছে, জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসনে মোট ভোটার চার লাখ দুই হাজার ৭৯৮ জন। এর মধ্যে পোস্টাল ভোটার রয়েছেন ৪ হাজার ৫৬৮ জন। পোস্টাল ভোটার ব্যতিত পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯০ জন এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৪০১ জন।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ডুমুরিয়ায় প্রায় ৩৫ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। ফুলতলায় এই সংখ্যা ৮ শতাংশের কিছু বেশি। ভোটের পরিসংখ্যানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জিতেছেন বেশির ভাগ সময়। জাতীয় পার্টি ও বিএনপি জিতেছে একবার। চার দলীয় জোট প্রার্থী হিসেবে একবার জামায়াতের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন গোলাম পরওয়ার। ২০০৮ ও ২০১৮ সালে আরও দুইবার নির্বাচনে অংশ নিয়েও বিতর্কিত ভোট গ্রহণে পরাজিত হন তিনি। আওয়ামী লীগ বিহীন এবারের নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায় ও নারী ভোটাররা মূল ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন সবাই।
ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মো. মাহবুবুর রহমান তার এলাকায় লবির পক্ষে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, যখন কাজ শুরু করেছিলাম তখন পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। বলা যায় ২৫-৭৫ ব্যবধান। মহিলা ভোটারদের মধ্যে আমাদের অবস্থান ছিল শুন্য। তবে সময়ের সাথে সাথে পরিকল্পিতভাবে কাজ করায় আমরা এখন অনেক এগিয়েছি।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, পালিয়ে বা আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। জোর সস্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে হিন্দু ধর্মের শীর্ষ নেতাদের সাথেও। তারা ধানের শীষে শুধু ভোট দেওয়াই নয়, পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন। ফলে বিজয়ের ব্যাপারে তারা দৃঢ় আশাবাদী।
সম্প্রতি খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ সময় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হওয়া নিয়ে সংশয় ও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দি প্রার্থী কালো টাকা ছড়ানোর পাশাপাশি সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের এলাকায় জড়ো করছেন। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও হিন্দু ধর্মের নেতাদের মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার হুকুম দেওয়া হচ্ছে।
সংখ্যালঘু ভোটার অধ্যূষিত রংপুর ইউনিয়নের শলুয়া বাজার। বাজারের একটি দোকানের বারান্দায় বসে বিশালাকৃতির টানা জালের ছিড়ে যাওয়া বিভিন্ন অংশ মেরামতের কাজ করছিলেন দেবরঞ্জন বিশ্ব ও তার ছেলে কার্তিক বিশ্বাস। জাল মেরামত করাই তাদের পেশা। তাদের ভাষায় ভোটের পরিবেশ খুব ভালো, কোনো ঝামেলা এখনও পর্যন্ত হয়নি। কার অবস্থান ভালো জানতে চাইলে জানালেন, দুই পার্টির লোকজনই ভোট চেয়েছেন। তবে পরওয়ার সাহেব এলাকার মানুষ। অনেক দিন যাবৎ তাদের পাশে আছেন। তাছাড়া বিল ডাকাতিয়ার সমস্যা মেটাতে হলে পরওয়ার সাহেবের বিকল্প নেই।
তবে ভিন্নমত ভ্যানচালক প্রকাশ সরকারের। নিজেদের নিরাপত্তা ও সম্পদ রক্ষার্থে ধানের শীষ রক্ষাকবচের কাজ করবে বলে মনে করছেন তিনি। ভোটে নৌকা মার্কা না থাকায় হিন্দুদের ভোট একচেটিয়া কোথাও যাবেনা বলে ধারণা তার।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও ব্যবসা বাণিজ্যে অচলবস্থায় প্রচণ্ড ক্ষুব্দ সলুয়া বাজারের সুব্রত জুয়েলার্সের মালিক দেবব্রত রায় বললেন, নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া অধিকার। আমি গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়া জন্য কেন্দ্রে যাবো। এমপি ভোট কাউকে দেবেন না জানিয়ে বলেন, তবে তার কেন্দ্রে ধানের শীষ বেশি ভোট পাবে।
শাহপুর, থুকড়া, আমভিটা এলাকার একাধিক গৃহবধুর সাথে কথা হলে তারা দাঁড়িপাল্লা প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়ে বলেন, তাদের এলাকায় মহিলাদের সিংহভাগ ভোট এবার পরওয়ার সাহেব পাবেন। আওয়ামী লীগের অত্যাচারি স্বভাবের নেতাকর্মীরা বিএনপির শেল্টারে এলাকায় ফিরে আসায় তারা ক্ষুব্ধ।
জামায়াতে ইসলামের কালিতলা স্কুল কেন্দ্রের প্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পরে হিন্দুরা বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও চাঁদাবাজির শিকার হয়। পরে তাদের অনেকেই জামায়াতের হিন্দু শাখায় যোগ দিয়েছে। জামায়াত সব সময় তাদের পাশে আছে। প্রতিপক্ষ নানা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ালেও নীরব ভোটাররা গোপন বুথে ভোট বিপ্লব ঘটাবেন বলেই বিশ্বাস তার।