কাঁচামালের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য রপ্তানি মূল্য না পাওয়া এবং বহুমুখী সংকটের কারণে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী কলারোয়ার রপ্তানিজাত মাটির টালি শিল্প আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই অঞ্চলের অন্তত ৭০ শতাংশ টালি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একসময়ে বিশ্ববাজারে সুনামের সঙ্গে রপ্তানি হওয়া এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কারখানার শ্রমিকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত কলারোয়ার টালি পল্লিতে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০টি সক্রিয় কারখানা ছিল। সুন্দর নকশা ও টেকসই মানের কারণে এখানকার তৈরি ‘ফেক্স অ্যাঙ্গুলার’, ‘হেড ড্রাগুলার’, ‘স্কার্টিং’, ‘স্ট্যাম্প’, ‘স্কয়ার’, ‘রুফ’, ‘ব্রিকস’ ও ‘ফ্লোর টালি’ ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হতো। টালি শিল্পের এই ব্যাপক প্রসারের কারণে এলাকাটি একপর্যায়ে ‘ইতালি পাড়া’ নামে খ্যাতি লাভ করে। তখন প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছিল এই পল্লিতে। দেশের বড় বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানও এখান থেকে সরাসরি টালি সংগ্রহ করত।
তবে ২০১৬ সালের পর থেকে চিত্র বদলাতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে বন্ধ হতে হতে বর্তমানে সচল কারখানার সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১২ থেকে ১৪টিতে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, উৎপাদন ক্ষমতা কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। স্থানীয় একজন কারখানা মালিক আবুল হোসেন জানান, ২০১৬-১৭ সালের দিকেও যেখানে একটি কারখানায় দৈনিক ১০ থেকে ১২ হাজার পিস টালি তৈরি হতো, সেখানে বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার পিসে। যে কয়টি কারখানা এখনো কোনোমতে টিকে রয়েছে, সেগুলোর আর্থিক অবস্থাও বেশ শোচনীয়।
কারখানা কমে যাওয়ায়, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ শ্রমিকরা। শ্রমিক হাসানুজ্জামান, রাবেয়া খাতুন এবং রফিকুল ইসলাম জানান, দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা শ্রমিকরা এখন কাজ হারিয়ে দিশাহারা। কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ায় অনেক শ্রমিকের দৈনন্দিন আয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এ বিষয়ে বিসিক সাতক্ষীরার উপব্যবস্থাপক গৌরব দাস জানান, সাতক্ষীরার এই সম্ভাবনাময় টালি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিসিক আন্তরিকভাবে কাজ করছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ক্ষুদ্রঋণ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে বিসিক প্রস্তুত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক তদারকি, স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে সাতক্ষীরার ক্ষয়িষ্ণু এই টালি শিল্প আবার তার পুরোনো ঐতিহ্য ও বিশ্ববাজারে নিজস্ব অবস্থান ফিরে পেতে পারে।