বিদেশে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ রয়েছে টানা ৮ মাস ধরে। জুট মিলগুলোকে কাঁচামাল সংকট থেকে বাঁচাতে সরকার মাঝেমধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সে সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকে সীমিত সময়ের জন্য। এবার দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা না ওঠায় সংশ্লিষ্ট সেক্টরে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও উৎপাদনকারী কৃষকদের মাঝে অনিশ্চয়তাজনিত হতাশা বিরাজ করছে। তবে আগে থেকেই রপ্তানির বিপরীতে আমদানিকারকের টিটি (টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার) পাওয়ায় ১৮টি প্রতিষ্ঠান ৬ হাজার ৩৭৭ টন কাঁচা পাট রপ্তানি করতে পারবে। যার বড় অংশই যাবে ভারতে।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ) সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার এক প্রজ্ঞাপনে কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রপ্তানি পণ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। শর্তের এই বেড়াজালে মূলত কাঁচা পাট রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অতীতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সরকারের কয়েক দফা বৈঠক হতো। কিন্তু এবারের সিদ্ধান্ত এককভাবে নেন সাবেক সরকারের বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। ব্যক্তিগত স্বার্থে জুট মিল মালিকদের পক্ষ নিয়ে তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন বলে সূত্রের অভিযোগ।
সূত্র জানিয়েছে, পাট রপ্তানি বন্ধ থাকলেও ৮ মাস ধরে তারা অফিস ভাড়া, গোডাউন ভাড়া, ব্যাংক ঋণের সুদ, ইন্স্যুরেন্স, শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন-মজুরি, সিকিউরিটি গার্ডের বেতন পরিশোধ করছেন। অনেকেই নিষেধাজ্ঞা জারির আগে সামর্থ্য অনুযায়ী পাট কিনেছিলেন। মাসের পর মাস গোডাউন বন্ধ থাকায় পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। এদিকে জুন মাসের শেষে সবাইকে নতুন অর্থ বছরের জন্য লাইসেন্স রিনিউ করতে হবে। ভ্যাট, ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে। ব্যাংক ঋণের সমন্বয় করতে হবে। গোডাউন ভাড়া চুক্তি করতে হবে। এক টাকা আয় না থাকলেও ব্যয়ের বিশাল চাপ সামলানোর চিন্তায় দিশাহারা ব্যবসায়ীরা।
বিজেএর চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানির কারণে জুট মিলে কিংবা স্পিনিং মিলে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে না। আমার উৎপাদিত পাটের মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রপ্তানি করি। এরপরও পাট উদ্বৃত্ত থেকে যায়। পাট মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থ-বছরে ৩ দশমিক ৫২ লাখ বেল পাট মজুত ছিল। এবার মৌসুম শেষে ২০ লাখ ৪০ হাজার বেল পাট মজুত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ হারাবেন বলে মনে করছেন তিনি।
আলমগীর কবির জানান, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য উপদেষ্টার সঙ্গে অন্তত ১৮/২০ বার বৈঠক করেছেন। তবে কোনো ফল পাননি। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের পাটমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হলে তিনি শুধু টিটি (টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার) পাট রপ্তানির অনুমতি দিয়েছেন। এর আওতায় ৬ হাজার ৩৭৭ টন পাট যাবে ভারতে। তবে এলসির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে কোনো লাভ হবে না। এলসি’র ৭ হাজার ৯৫০ টন পাট রপ্তানির জন্য তিনি মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন বলে জানান।
এদিকে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম কমিয়ে দিয়েছেন মিল মালিকরা। এতে চরমভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষক ও সরবরাহকারী (ফড়িয়া)। গত ২ মে যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত আকিজ জুট মিলের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন শেষে কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা।
ফরিদপুরের পাট ব্যবসায়ী আনিস খালাসী অভিযোগ করেন, আকিজ জুট মিলের শামীম রেজা সাহেব তাকে প্রতিমণ পাটে ৫ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করে দেবেন বলে কথা দেন। তিনি ১২ ট্রাক পাট দেওয়ার পর গত বুধবার ও সোমবার দুই দফা বিল দেওয়ার সময় প্রতি মণের দাম দিয়েছেন যথাক্রমে ৪ হাজার ৯০০ ও ৪ হাজার ৮০০ টাকা। প্রতি গাড়িতে তার লোকসান হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
একই অভিযোগ মাগুরার বুনোগাতির রাজু শিকদারের। মিলের ক্রেতা তাকে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করে দাম দেবে কথা দিয়ে এখন ৪ হাজার ৮০০ টাকা বিল দিয়েছে। প্রতিমণ পাটে তার লোকসান ৫০০ টাকা। তিনি বলেন, মিলের মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই। তারা দেখা দেন না। প্রতিবাদে আমরা স্মারকলিপি দিয়েছি।
এদিকে বিনা নোটিসে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় সারা দেশের অন্তত এক লাখ শ্রমিক পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেন দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম রাজু। তিনি আমার দেশকে বলেন, এমন দুঃসময় আমাদের জীবনে আসেনি। রাতের মধ্যে শ্রমিকরা সবাই কর্মহীন হয়ে পড়ল।
বিজেএ চেয়ারম্যানের অভিযোগ, সাবেক পাট উপদেষ্টা পারিবারিকভাবে সারা দেশে কমপক্ষে ১৪টি জুট মিলের মালিক। মালিকদের স্বার্থ বাঁচাতে তিনি এককভাবে এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে আকিজ জুট মিলের চেয়ারম্যান শেখ নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
উল্লেখ, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, চীন, তিউনিশিয়া, ব্রাজিল, রাশিয়াসহ ১৫টি দেশে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়।