এক কিলোমিটারের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে মিলবে না ইটভাটার অনুমোদন। এ কারণে ভাটার মালিকদের চাপে বন্ধ হয়ে গেছে বিকেএমএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। এখন চার গ্রামের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার জন্য পাঁচ-ছয় কিলোমিটার (কিমি) পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় দূরের স্কুলে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের কুলবাড়িয়া গ্রামে ঘটেছে এমন ঘটনা। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের কাঁঠালতলা বাজার থেকে পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে স্কুলটির অবস্থান। বাগআঁচড়া, কুলবাড়িয়া, মুড়াবুনিয়া ও সুন্দরবুনিয়া— এই চার গ্রামের আদ্যাক্ষর নিয়ে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিকেএমএস হাইস্কুলটিতে গত বছর ও চলতি বছর একদিনও ঘণ্টা বাজেনি।
জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১৭/২ পোল্ডারের অধীনে ঘ্যাংরাইল নদীর তীর ঘেঁষে পাশাপাশি গড়ে উঠেছে পাঁচটি ইটভাটা। অবৈধ ইটভাটা বিরোধী অভিযানে ডুমুরিয়ার বেশির ভাগ ইটভাটা যখন গুটিয়ে ফেলেছে কার্যক্রম, সে সময় প্রবল দাপটে কাজ চলেছে এই পাঁচটির। বাধাহীনভাবে প্রায় বছরব্যাপী উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছেন ভাটা মালিকেরা। ইট পোড়ানোর বিষাক্ত ধোঁয়া, দিনভর ভারী ট্রাক, ডাম্পট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল আর অবাধে নদী থেকে মাটি কাটায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে জনজীবন ও পরিবেশ-প্রতিবেশ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কাঁঠালতলা বাজার থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে কুলবাড়িয়া গ্রামের শুরুতে মেসার্স বাহার ব্রিকস। গত বছরের ৬ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় আগুন নেভানোর পর ভাটাটি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সাত ইটভাটাকে ১৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। বাহার ব্রিকসে এবার পুরোদমে উৎপাদন চলছে। দুটি ভেকু মেশিনে নদীর চর থেকে মাটি কেটে স্তূপ করা হচ্ছে। এর পাশেই সমানে কাজ চলছে মেসার্স আল্লাহর দান ব্রিকসের।
বাহার ব্রিকসের ম্যানেজার আব্দুল লতিফ গাজী দাবি করেন, তারা রেকর্ডীয় জমিতে ভাটা করেছেন, নদী বা চর দখল করেননি। বরং তাদের জমি নদীতে ভেঙে গেছে।
বিকেএমএস মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাত্র ৪০০ মিটার দূরে পুষ্পক সরদারের মেসার্স সরদার ব্রিকস। ভাটায় কয়লা পোড়ানো হলে দক্ষিণের বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া সবার আগে গ্রাস করে এই স্কুলটিকে। এতে ছাত্রছাত্রীরা কাশতে কাশতে স্কুল ছেড়ে বাড়ি চলে যেত বলে অভিযোগ করলেন স্থানীয় বাসিন্দা রিংকু রাণী মণ্ডল। তার দুই ছেলে এই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে। অথচ দুই বছর ধরে কোনো ক্লাস হচ্ছে না।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক শংকর মহলদার জানান, স্কুল ভালো চলছিল। এখনো ক্লাস সিক্স ও এইটে বোর্ড রেজিস্ট্রেশন করা স্টুডেন্ট আছে। কিন্তু আমরা ক্লাস নিতে পারছি না। ম্যানেজমেন্টে পরিকল্পিতভাবে ঝামেলা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে, যার সঙ্গে ইটভাটার পার্টনাররা জড়িত। জনবসতির মধ্যে ভাটা হয় কীভাবে— প্রশ্ন রাখেন তিনি।
কুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক কার্তিক রায় জানালেন, আমাদের জমিতে ধান ও সবজির ফলন কমে গেছে। ঘেরে মাছ হচ্ছে কম। ভাটা থেকে কালো ধোঁয়া, ছাই উড়ে বেড়ায়। আমাদের কাশি, শ্বাসকষ্ট লেগে থাকে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য পাঁচ কিমি দূরে কাঁঠালতলা, আন্ধারমানিক অথবা ছয় কিমি দূরে মান্দারতলায় যেতে হয়।
মৃতপ্রায় ঘ্যাংরাইল নদীর অপর পাড়ে মনোহরপুর গ্রামে মেসার্স রিপা ব্রিকস। যাতায়াতের জন্য নদীর ওপর পাকা ব্রিজ নির্মাণ হয়েছে ২০২২ সালে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এর আগে পাউবো নদী খনন করায় গতিপ্রবাহ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ব্রিজ নির্মাণের জন্য ভাটার আধলা ভাঙা ইট নদীতে ফেলে স্রোত অবরুদ্ধ করা হয়। তাদের দাবি- এখনো মাটি খুঁড়লে তলদেশে ইট পাওয়া যাবে।
জানতে চাইলে ভাটা মালিক আমিনুর রহমান উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। নদীর ওপর ব্যক্তি উদ্যোগে ব্রিজ নির্মাণ করা যায় কিনা— এ প্রশ্নের উত্তর সে সময়ে সরকার ও প্রশাসনে যারা ছিল তাদের কাছ থেকে নিতে বলেন।
আটলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রতাপ কুমার রায় জানান, সাবেক মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ছিলেন ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি। মূলত তার হুকুমে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ব্রিজ তৈরি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন কিংবা পাউবো কিছু করতে পারেনি। টাকার জোরে ভাটা মালিকরা ধরাকে সরাজ্ঞান করেন। পরিবেশ ধ্বংস হলেও তাদের কিছু যায় আসে না।
সাবেক মন্ত্রী নারায়ণের কেপি ব্রিকসের জন্য মাটি তোলায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। পাড় ভেঙে বরাতিয়া গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে নদী। তার দাবি, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন করায় ভাটা মালিকরা জোটবদ্ধ হয়ে গত নির্বাচনে তাকে হারাতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে।
কুলবাড়িয়া গ্রামের শেষপ্রান্তে রঞ্জন কুমার সরদারের মেসার্স ভাই ভাই ব্রিকস। ভাটার অদূরে মাটি স্তূপ করে রাখায় যেন কৃত্রিম পাহাড় তৈরি হয়েছে। অন্তত ১০টি ট্রলিতে নদীর চরের মাটি কেটে আনা হচ্ছে। সেই মাটি লেভেল করছে দুটি স্কেভেটর মেশিন। জানা গেছে, বিভিন্ন ইটভাটায় মৌসুমে ৩০-৫০ লাখ পিস ইট তৈরি হয়। কিন্তু এসব ভাটায় প্রতি বছর এক কোটি থেকে সোয়া কোটি পিস ইট তৈরি হয়। প্রশাসন থেকে অভিযানে এলে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজের চেষ্টা চালান মালিকরা।
ইটভাটা ও ভাটা প্রস্তুত (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯) অনুযায়ী, লাইসেন্স নেওয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তি ইট উৎপাদন করতে পারবে না। কৃষি জমি বা নদী থেকে মাটি সংগ্রহ করতে পারবে না। জনবসতি এলাকায় ও স্কুল থাকলে এক কিলোমিটারের মধ্যে ভাটা স্থাপন করতে পারবে না। গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে ভারি যানবাহন দ্বারা ইট বা কাঁচামাল পরিবহন করতে পারবে না। যার শাস্তি হিসেবে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ডুমুরিয়া এই আইনের প্রতিটি ধারা লংঘন হচ্ছে।
ডুমুরিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মো. শাহজাহান জমাদ্দার বলেন, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইটভাটাগুলো অবদান রাখলেও আমরা সবদিকে বঞ্চনার শিকার। আইনের নানা মারপ্যাঁচে আমাদের গলা টিপে ধরা হচ্ছে। এক সময় ডুমুরিয়ায় ৩৫ ইটভাটা ছিল, এখন ১৮টি টিকে আছে। কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও ভাটা মালিকরা লাইসেন্স না পাওয়ায় অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এজন্য অটোব্রিকস কোম্পানিগুলোর কারসাজি দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমএস স্কুলটি এমপিওভুক্ত হয়েছে জানিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ইটভাটার বিষয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দেখবে।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার জানান, স্কুল ও ইটভাটাগুলো সম্পর্কে দ্রুত খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।