দীর্ঘদিন ধরে যশোর, নড়াইল, খুলনাসহ আশপাশের অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা আলোচিত চরমপন্থি নেতা নাসির শেখ গোফরানকে (৪৫) আটক করেছে যশোরের ডিবি পুলিশ।
যশোরের অভয়নগরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে আতঙ্কের আরেক নাম হয়ে ওঠা বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির পরিচয়দানকারী গোফরানকে তার সহযোগী সোহেল রানাসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গোফরান বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পরিচয়ে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে যশোর, খুলনা ও নড়াইলজুড়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলবাজির রাজত্ব চালিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে রয়েছে অস্ত্র, হত্যা, চাঁদাবাজিসহ ২০টিরও বেশি মামলা।
এর মধ্যে ১১টি মামলায় ছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তার সহযোগী সোহেল রানার বিরুদ্ধেও রয়েছে অন্তত সাতটি মামলা।
সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে যশোর জেলা পুলিশের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার এই দুর্ধর্ষ দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার ও তাদের সম্বন্ধে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পুলিশ জানায়, গোফরান অভয়নগর উপজেলার ধুলগ্রামের তছির উদ্দিনের ছেলে। গত ১ মার্চ গভীর রাতে অভয়নগরের গোপীনাথপুর গ্রামে জামাল সিকদার নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে গোফরান বাহিনী। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা নগদ ২০ হাজার টাকা, একটি মোটরসাইকেল, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায়।
এই ঘটনায় জামাল সিকদারের ছেলে সোহেল সিকদার চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই মামলার প্রধান আসামি গোফরান। অন্য আসামিরা হলেন ইছামতি গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে রানা, গোপীনাথপুর গ্রামের আজম খানের ছেলে জুবায়ের খান এবং ধুলগ্রামের লাহু।
ঘটনার পর থেকেই গোফরান বাহিনীর প্রধান গোফরানকে ধরতে তৎপর হয় ডিবি পুলিশ। ডিবির এসআই কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি টিম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান চালিয়ে গত শনিবার (১৪ মার্চ) খুলনার রূপসা উপজেলার জাবুসা গ্রাম থেকে তাদের আটক করে।
ওই সময় গোফরানের কাছ থেকে একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেল ও ল্যাপটপ এবং সোহেল রানার কাছ থেকে একটি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়, যা লুট করে নিয়েছিল এই সন্ত্রাসীরা।
এদিকে গোফরানের দাবি, সোহেল রানার কাছে তিনি টাকা পেতেন। টাকা না দেওয়ার জের করে বাড়ি থেকে মোটরসাইকেল, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনসেট নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
সোমবার (১৬ মার্চ) গোফরানকে আদালতে নেয় পুলিশ। সে সময় সংবাদকর্মীদের দেখে গোফরান বলতে থাকেন, ‘চরমপন্থি দলের মূল সদস্য ইছামতি গ্রামের মিন্টু সিকদার ও ধুলগ্রামের ইমান। মিন্টু সিকদার আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, এখন বিএনপি করে। আর তাদের মূল নেতা মতিয়ার ফারাজী (গেল নির্বাচনে যশোর-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী)। চাঁদাবাজিই তাদের প্রধান পেশা।’
তিনি বলেন, ‘আমাকে এই পথে নিয়ে আসে মিন্টু সিকদার। আগে জালটানার (মৎস্য শ্রমিক) কাজ করতেন। আর এখন মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়েছে চাঁদা দাবি করে।
এক প্রশ্নের উত্তরের গোফরান বলেন, ‘ইছামতির মিন্টু আর ধুলগ্রামের ইমান আমার নাম করে চাঁদাবাজি করে। আমি একজনের কাছ থেকে চাঁদা নিলে ওরা ( মিন্টু-ইমান) পাঁচজনের কাছ থেকে টাকা নেয়। আর সবগুলো ঘটনায় নাম হয় আমার।’
গোফরান জোর দিয়ে বলেন, ‘ইছামতি গ্রামের মিন্টুকে আটক করতে পারলে পুরো অভয়নগরের চাঁদাবাজি কমে যাবে। আমি নিজেও চাঁদাবাজি করবে না। আমার দুটো অস্ত্র মিন্টু আর ইমানের কাছে আছে।’
কীভাবে চাঁদাবাজি করেন?- এক সাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে জবাবে গোফরান বলেন, ‘অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি করি। ভয় না দেখালে কেউ চাঁদা দেয়?’
তিনি বলেছেন, ‘যারা মাছের চাষ করে, ঘের মালিক, বড় ব্যবসায়ী। বছরে অনেক টাকা আয় করে, তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করি।
আগে কাজ করতাম, এখন চাঁদাবাজি করে চলি। আগে ভালো ছিলাম।’
খারাপ হলেন কেন?- এমন প্রশ্নের তার জবাব, ‘মিন্টু, ইমানসহ অনেকের সঙ্গে মিশে খারাপ হয়েছি। আগে কখনও পুলিশের হাতে ধরা পড়িনি। প্রথমবারের মতো ধরা খেলাম।’