প্রকল্প কাগজে কলমে
জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচির আওতায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্প মাঠ পর্যায়ে নয়, বাস্তবায়ন হয়েছে কাগজে-কলমে— এমনই অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নবঞ্চিত, পাশাপাশি বঞ্চিত হয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান থেকেও।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিস সূত্রে জানা যায়, সরিষাবাড়ী উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচির আওতায় কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে ২কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকির কথা ছিল উপজেলা নির্বাহী অফিসার, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের।
তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়নে তদারকির বদলে কাগজে-কলমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা হাতিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে করেছেন ভাগবাঁটোয়ারা অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনিয়ন পরিষদগুলোর বেশ কজন সচিব।
অভিযোগে জানা যায়, সরিষাবাড়ী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শওকত জামিল প্রকল্পগুলো থেকে ৩৫ পার্সেন্ট টাকা নিজে কেটে নিচ্ছেন। ৫ পার্সেন্ট টাকা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও অফিস খরচ দেখিয়ে কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কজন ইউপি সচিব বলেন, প্রকল্পের প্রতি ১০০ টাকায় প্রায় ৪০ টাকা বিভিন্ন খাতে কর্তনের কথা জানানো হয়। এতে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে মানসম্মত কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের দাবি, বরাদ্দ কমে যাওয়ায় কোথাও আংশিক কাজ করা হচ্ছে, আবার কোথাও কাগজে-কলমে অগ্রগতি দেখানো হয়েছে।
ভাটারা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের মেঠাগামী পাকা রাস্তার হানিফের দোকান থেকে আজিজুল তালুকদারের বাড়ির পশ্চিম পাশে খোকার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত কাজে বরাদ্দ ২ লাখ টাকা। কামারবাদ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে ইব্রাহিমের বাড়ি থেকে কালু মন্ডলের বাড়িগামী রাস্তা সংস্কার কাজে বরাদ্দ ২ লখি ৭ হাজার টাকা।
মহাদান ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ সংস্কার কাজে বরাদ্দ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। মহাদান ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডে কাজল মোল্লাবাড়ির সামনে ইছাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারকাজে বরাদ্দ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। মহাদান ইউনিয়নের ০৩ নং ওয়ার্ডে বাইতুননুর মসজিদে টিউবওয়েল বসানোর জন্য মাটি ভরাটকাজে বরাদ্দ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই প্রকল্পগুলোতে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা।
ডোয়াইল ইউনিয়নের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাজের সুবিধাভোগী জয়নাল আবেদীন বলেন, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রকল্পের পুরো টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। উন্নয়নের নামে যা হচ্ছে তাতে বলতে হয়, এ যেন উন্নয়নের নামে লুটপাট।
একাধিক প্রকল্প সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্ধ হলেও একটি প্রকল্পে টাকা নানা স্তরে ভাগ হয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা কর্তনের পর আরো ৫ হাজার টাকা স্ট্যাম্প ও অন্যান্য খরচের কথা বলে আমরা হাতে পেয়েছি ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ২ লাখ ১০ হাজার টাকার প্রকল্প ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।এই অর্থে প্রকল্পের কাজ করা সম্ভব নয়।
আওনা ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ডের সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যান আমাকে ২ টি প্রকল্পে সভাপতি নিযুক্ত করেছে। কিন্তু আমাকে প্রকল্পের কাজে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। প্রকল্প বিষয়ে বলতে গেলে সরকার দলীয় লোকজন দিয়ে আমাকে নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে।
সরিষাবাড়ী উপজেলার একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, “প্রতিটি প্রকল্পে সাংবাদিক, নেতাকর্মী ও অফিস খরচের কথা বলে প্রায় ৪০ শতাংশ টাকা কেটে বিল দেওয়া হয়েছে। এত বড় অঙ্কের অর্থ কেটে নেওয়া হলে কাজের মান ভালো হওয়ার সুযোগ খুবই কম।”
তাদের প্রশ্ন, “যদি প্রকল্পের বড় অংশের টাকা আগেই কেটে নেওয়া হয়, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের আগ্রহ বা স্বার্থ কোথায়?”
কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসুচি (কবিখা) প্রকল্পের গম বরাদ্দ নিয়েও উঠেছে অভিযোগ।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কম দামে গম গোডাউনে জমা রেখে প্রকল্পের সভাপতি ও সম্পাদকদের হাতে নামমাত্র টাকা তুলে দিচ্ছে। এতে সরকারি বরাদ্দের প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। দরিদ্র জনগোষ্টি কর্মসংস্থানের কথা প্রকল্প উল্লেখ থাকলেও প্রকল্পেগুলোতে তালিকায় শ্রমিকের নাম থাকলেও তারা কাজ পায়নি। ভুয়া টিপসহি দেখিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানও সম্পন্ন করেছেন কাগজে কলমে বেশকটি প্রকল্পের নাম তালিকভুক্ত শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শওকত জামিলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা রিসিল অভিযোগ বিষয়ে বলেছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত স্বাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে জামালপুরের জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলী বলেছেন, বিষয়টি খোঁজ নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলছি । উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হবে। তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকার সামাজিক সুরক্ষায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের আওতায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কবিটা) কর্মসূচির বরাদ্দে টাকা ও গম গচ্চা যাচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না তদরকির অভাবে। তদরকির দায়িত্বে যারা তারাও তদারকি না করে ভাগভাটোয়ারা করায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে কাজ বঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন বঞ্চিত ভুক্তভোগী স্থানীয়রা।