২৫ হাজারের জমি পৌনে ৩ হাজার দিল পুলিশ
জমিতে বছরে দুবার ধান হয়। একবার হয় টমেটো। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে কৃষকদের এমন জমি এক বছরের জন্য প্রতি বিঘা বর্গা হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। অথচ গোদাগাড়ী থানার পুলিশ বিঘাপ্রতি পৌনে ৩ হাজার টাকা ধরে ৭০ বিঘা জমি ইজারা দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ তাদের এক সোর্সকে পানির দরে এই জমি দিয়ে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় পুলিশ পুনরায় জমি নিলাম দিতে আদালতের অনুমতি চেয়েছে। এই জমিগুলো গোদাগাড়ীর মাটিকাটা ইউনিয়নের কৃষ্ণবাটি মৌজায়। জমিগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে আদালতে মামলা চলছে। তাই আদালত জমিগুলো গোদাগাড়ী থানার পুলিশকে রিসিভার (জিম্মাদার) দিয়েছেন।
থানা থেকে প্রতি বছরের জন্য জমিগুলো ইজারা দেওয়া হয়। ইজারার টাকা জমা থাকে। মামলা নিষ্পত্তির পর জমির মালিক সব টাকা পাবেন। প্রতি বছর পানির দরে জমিগুলো ইজারা দেওয়ায় মালিকপক্ষ ক্ষতিগ্রন্ত হচ্ছে।
এবার বাংলা ১৪৩৩ সনের জন্য জমিগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে গত ১২ এপ্রিল। জমি নিলাম দেওয়ার আগে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে ৮ এপ্রিল স্থানীয় একটি পত্রিকায়। আবার এলাকায় মাইকিং এবং ঢুলি দিয়ে ঢোল পিটিয়ে ইজারার বিষয়টি প্রচার করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। মাত্র ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকায় অনেকটা গোপনে জমিগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে। বিঘাপ্রতি ইজারামূল্য হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৭৫০ টাকা। অথচ ওই এলাকায় জমি ইজারা হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমি নিলাম দেওয়ার সময় গোদাগাড়ী থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন না। ওসির দায়িত্বে ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোমিনুল হাসান। তিনি মো. অলিউল্লাহ নামের এক যুবককে জমিগুলো ইজারা দিয়েছেন। তার বাড়ি গোদাগাড়ী পৌর এলাকার আঁচুয়া এলাকায়। এলাকায় তিনি পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পানি দরে জমি ইজারা দিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন।
অলিউল্লাহকে জমি দেওয়ার পর গত ১৭ মার্চ থানায় নতুন ওসি হিসেবে এসেছেন আতিকুর রহমান। প্রকৃত কৃষক বাদে পুলিশের সোর্সকে এভাবে গোপনে জমি দেওয়ার বিষয়টি কৃষকেরা ওসিকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছেও অভিযোগ দিয়েছেন তারা। কৃষকেরা বলেছেন, ন্যায্যমূল্যে জমি নেওয়ার জন্য উন্মুক্ত নিলামে অংশগ্রহণের তারা সুযোগ চেয়েছিলেন, কিন্তু তা দেওয়া হয়নি।
অভিযোগকারী কৃষ্ণবাটি গ্রামের বাসিন্দা মো. হাসানুজ্জামান বলেন, জমিগুলোতে একবছরেই দুই মৌসুমে প্রায় ৪৫ মন ধান উৎপাদন হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৫৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি শীতকালীন টমেটো চাষেও লাখ টাকা আয় হয়। উন্মুক্ত নিলাম হলে ইজারা মূল্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারত। কিন্তু গোপনে নামমাত্র মূল্যে নিলাম দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে গোদাগাড়ী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোমিনুল হাসান বলেন, ‘নিয়ম-কানুন মেনেই নিলাম দিয়েছি। এখানে কোনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়নি। যারা আরও কম টাকায় নিলাম নিতে পারেনি, তারা অভিযোগ করছে।’ এত কম টাকায় নিলাম দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এর আগের বছরগুলোতে এর চেয়েও কম টাকায় নিলাম হয়েছে। এবার পাঁচজন নিলামে অংশ নিয়েছিল। সর্বোচ্চ দরে নিলাম দেওয়া হয়েছে।’
গোদাগাড়ী থানার ওসি আতিকুর রহমান জানান, জমি ইজারায় অনিয়ম হয়েছে এমন অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। নিলাম বিজ্ঞপ্তি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ করার কথা থাকলেও তিনি জেনেছেন যে স্থানীয় পত্রিকায় সেটা দেওয়া হয়েছে। জমি প্রকাশ্যে নিলাম দেওয়ার কথা। কিন্তু এ ব্যাপারে অভিযোগ আসায় জমি পুনরায় ইজারা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (এডিএম) আদালতে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। এখনও সিদ্ধান্ত পাননি।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (এডিএম) দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন, জমির ইজারার মূল্য কম হলে মালিকপক্ষ ঠকবেন। রিসিভারের জমির নিলামের অর্থ সরকার পায় না। এই টাকা জমা থাকে। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর নিলামের টাকা মালিক পাবেন। গোদাগাড়ীতে রিসিভারের জমি নিয়ে এমন অনিয়মের বিষয়টি তিনি জানেন না। ওসির আবেদনটিও দেখেননি। আবেদনটি খুঁজে দেখে তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন বলে জানিয়েছেন।