নবসৃষ্ট বগুড়া সিটি করপোরেশনে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসতি। শহরটিতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০ টন ময়লা-আবর্জনা জমা হয়। সেগুলো নিয়ে ফেলা হয় শহরের নিকটবর্তী ভাগাড়ে। সীমিত সক্ষমতা নিয়ে বর্জ্য অপসারণে রীতিমতো চলছে যুদ্ধ। ভাড়ায় চালিত ১৬টি আর নিজস্ব দুটি ট্রাক এবং একটি লোডার দিয়ে কোনোরকম কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন।
তিনি জানান, শহরতলির দুই পাশে দুটি ডাম্পিং স্টেশন নিজস্ব করার ব্যবস্থাসহ নিজস্ব পরিবহন পুলে ২০০ কোটি টাকার ডাম্প ট্রাক ও লোডারের চাহিদা সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে।
প্রায় দেড়শ বছরের প্রাচীন এ পৌরসভায় আজও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে বর্জ্যগুলো ঘুরেফিরে লোকালয়ের মাঝেই পড়ে থাকে। গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর এ মাসের শেষদিকে সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পৌরসভার সক্ষমতা না থাকায় উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য-আবর্জনা ফেলে রাখায় দূষিত হচ্ছে পানি ও বায়ু। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে প্রাণবৈচিত্রে। এদিকে গত দুবছরে ২১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নেই। সেসব স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। এসব নিয়ে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে বর্জ্য অপসারণকাজ তদারকিরও গতি কমে গেছে।
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু না করার ব্যর্থতা স্বীকার করে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী রেজাউল করিম বলেন, বড় আকারে বাজেটের প্রকল্প ছাড়া এমন পরিকল্পনা নেওয়া সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। বিগত সময়ে একবার এমন প্রকল্প প্রস্তাবনা এসেছিল; কিন্তু নানা জটিলতায় সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।
জানা যায়, ২০০৭ সালের আগে শহরের প্রতি মহল্লায় ডাস্টবিন থাকত। পৌরসভার বাসিন্দারা তাদের বাসাবাড়ির আবর্জনা সেখানে ফেলতেন। পরে পরিবেশ রক্ষায় সব ডাস্টবিন সরিয়ে দেওয়া হয়। ভ্যানের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ ডাস্টবিন চালু করে পৌরসভা। এ কাজের জন্য গঠন করা হয় মহল্লাভিত্তিক কমিউনিটি বেইজ অর্গানাইজেশন (সিবিও)। এই সংগঠনের মাধ্যমে ভ্যানগাড়িতে করে ময়লা নিয়ে শহরের বিভিন্ন ট্রান্সফার স্টেশনে রাখা হয়। সেখান থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ট্রাকে ময়লা নিয়ে গিয়ে ভাগাড়ে ফেলেন।
টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বগুড়া শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ও মিউনিসিপ্যাল সাপোর্ট ইউনিটের আওতায় এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। এতে বর্জ্য থেকে সার তৈরি, বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রাখা হয়। তবে সেটি এতদিনে হয়নি।
বিগত সময়ে সিবিওদের দেখভাল করে তখনকার পৌরসভার কনজারভেন্সি শাখা। সূত্র বলছে, বগুড়া পৌরসভায় প্রায় ১৭২টি সিবিও ছিল। এছাড়া গার্বেজ ট্রাক আছে ১৮টি। এর মধ্যে দুটি নিজস্ব ট্রাক, বাকিগুলো ভাড়া নেওয়া। একটি লোডার দিয়ে এতগুলো পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন দুই থেকে ৩০০ টন বর্জ্য অপসারণ করা কষ্টসাধ্য। তাছাড়া ভাড়ায় ট্রাক নিয়ে প্রতিদিনই ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।
এ ছাড়া শহরের আবজর্না রাখার ট্রান্সফার স্টেশনের মধ্যে স্থায়ী রয়েছে ৯টি ও অস্থায়ী সাতটি। ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশন দুটি। এ দুটির একটি বগুড়া শহরের জয়পুরপাড়ায়; অপরটি শহরের বাইরে এরুলিয়ায়। তবে দুটি ডাম্পিং স্টেশনই এখন বন্ধ আছে।
কনজারভেন্সি শাখার সুপারভাইজর মামুনুর রশিদ বলেন, শহরে ১৮টি ট্রাক দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০০ বার ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করতে হয়। এতে অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০ টন আবর্জনা হয়। সেগুলো ফেলা হয় বাঘোপাড়ায় মহাসড়কের পাশে ব্যক্তিমালিকাধীন জায়গায়।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দুটি ভাগাড় বর্তমানে বন্ধ আছে। আবার এখন যেখানে ফেলা হচ্ছে, সে জায়গার মালিক নিষেধ করলেই নতুন জায়গা খুঁজতে হচ্ছে। এটিও একটি সমস্যা। এদিকে নতুন জায়গা কেনার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসক।
গত দুদিনে শহরের একাধিক ট্রান্সফার স্টেশন ঘুরে দেখা য়ায়, বনানী রেশম উন্নয়ন বোর্ড, সেউজগাড়ী কৃষি অফিস, রেলস্টেশন, শিববাটি শিল্পকলা একাডেমির সামনে, চারমাথা নওগাঁ সড়কে ময়লার স্তূপ।
এছাড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে সপ্তপদী মার্কেটের সামনে, ফতেহ আলী বাজারের সামনে প্রতিদিনই ময়লার স্তূপ জমা হয়। এর মধ্যে অনেক এলাকার আবর্জনা সরাসরি গিয়ে করতোয়া নদীতে পড়ছে। এসব থেকে ময়লা অপসারণ করলেও দুর্গন্ধ সব সময় ভোগায় স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রান্সফার স্টেশনগুলোর কয়েকটিতে শেড থাকলেও কয়েকটি উন্মুক্ত। মোবাইল ডাস্টবিনে করে সিবিও শ্রমিকরা আবর্জনা নিয়ে এসে স্টেশনের সামনে ফেলছেন। এগুলো বেশিরভাগ রাস্তার ওপর গিয়ে পড়ে। আবার কাক, কুকুর ও কিছু ছিন্নমূল মানুষ এসব আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটি করে রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। ফলে পুরো ট্রান্সফার স্টেশন এলাকাজুড়ে দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায়। এতে আশপাশের বাসিন্দা ও পথচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন বগুড়ার বাসিন্দা ও অনুসন্ধানী ক্রিডস নামে বেসরকারি সংস্থার পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আতিকুর রহমান মল্লিক। তিনি বলেন, সাধারণত বর্জ্য বাসাবাড়ি, শিল্প-কারখানা, চিকিৎসা খাতসহ বিভিন্ন উৎস থেকে আসে। এগুলোতে দস্তা, সালফার, ক্যাডমিয়াম, নাইট্রোজেন, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে। এগুলোর অনুপাত আবার নির্ভর করে বর্জ্যের ধরনের ওপর। তিনি আরো বলেন, বর্জ্য কোথাও স্তূপ করে রাখলে সেখানকার মাটি ও বাতাস দূষণ করবে। পানিতে মিশলে জলাশয়ের প্রাণবৈচিত্র্যে আঘাত হানবে। এগুলো এক-দুদিনে দেখা যায় না। এ জন্য মানুষ এর প্রভাব বুঝতে পারে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী প্রাণঘাতি রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
বগুড়ায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু না হওয়ার বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান। তিনি জানান, এটি আমাদের জন্য আফসোস যে, আজও আমরা বর্জ্য রিসাইকেলিং ব্যবস্থাপনা চালু করতে পারিনি। খোলা স্থানে আবর্জনা থাকায় সেটি নদীর পানি ও মাটিতে মিশছে। ফলে বাতাস দূষিত হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০১৯-২০ সালের দিকে নেদারল্যান্ডস থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা এসেছিল বর্জ্য রিসাইকেল করার। এটি নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু বগুড়া হওয়ার কারণে জটিলতায় সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে প্রকল্পটি ফিরে যায়।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, আমাদের অন্যতম সমস্যা নিজেদের সক্ষমতা নেই। এজন্য কাজে একটু ঘাটতি থাকে। আর আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের জন্য বড় ধরনের প্রকল্প প্রয়োজন। এসব ডিপিএইচই এবং ইউএনএর মতো সংস্থাগুলো দিতে পারে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, বগুড়ায় বর্জ্য রিসাইকেল করার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা বলেছি, শহরের মধ্যে আবর্জনা না রেখে যেখানে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে নাÑএমন স্থানে রাখতে। আর সেটি একটি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা মেনেই করতে হবে। তবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট স্থাপনের মতো বড় পরিসরের জায়গা অচিরেই হবে হয়তো।