৫০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক খনিয়াদিঘি মসজিদ। মধ্যযুগীয় এ নিদর্শন শুধু ইতিহাসপ্রেমী নয়, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ।
মসজিদ শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের প্রাচীন জান্নাতবাদ নগরের উত্তর প্রান্তে খনিয়াদিঘির পশ্চিমপাড়ে অবস্থিত। মসজিদ রাজবিবি মসজিদ, খঞ্জনদিঘি মসজিদ বা চামচিকা মসজিদ নামে পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বিশ্বরোড মোড় থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। যাতায়াতের জন্য বাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি বা অটোরিকশা সহজলভ্য।
মসজিদের নির্মাণ তারিখ সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য শিলালিপি না থাকলেও মধ্যবর্তী মিহরাবের ওপরে উৎকীর্ণ একটি আয়াত পাওয়া যায়। স্থাপত্যশৈলী ও অলঙ্করণ রীতির ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, এটি ইলিয়াস শাহী বংশের দ্বিতীয় পর্বে ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।
পুরো ইমারত ইট ও পাথরের সমন্বয়ে নির্মিত। মসজিদের রয়েছে ৯ মিটার পার্শ্ববিশিষ্ট একটি বর্গাকৃতির নামাজ কক্ষ এবং পূর্বদিকে রয়েছে ৯ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি বারান্দা। নামাজ কক্ষের ওপর নির্মিত বিশাল গোলাকার গম্বুজটি স্থাপত্যিক বিশিষ্টতায় ভরপুর। বারান্দার ওপরে রয়েছে আরো তিনটি ছোট আকারের গম্বুজ। গম্বুজগুলোর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে অর্ধগম্বুজাকৃতির খিলান ও পেন্ডেন্টিভ, যা এক সময় বাংলার গম্বুজ স্থাপত্যে প্রাচুর্য লাভ করে।
নামাজ কক্ষের অভ্যন্তরে তিনটি মিহরাব রয়েছে, যার মধ্যে মধ্যবর্তী মিহরাবটি বৃহৎ ও সামনের দিকে প্রসারিত। আর পার্শ্ববর্তী দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট ও সরল। কেবলা দেয়ালের অভ্যন্তর ভাগ সম্পূর্ণরূপে গ্রানাইট পাথরের খণ্ডে আচ্ছাদিত। এ দেয়ালে তিনটি খাঁজকাটা খিলানবিশিষ্ট অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব স্থাপন করা হয়েছে, যার অলঙ্করণ এখনো স্পষ্ট।
মসজিদের চারকোণে রয়েছে আটকোনা বুরুজ, যেগুলো ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এছাড়া নামাজ কক্ষ ও বারান্দার সংযোগস্থলেও দুটি বুরুজ রয়েছে। প্রতিটি বুরুজ দৃষ্টিনন্দন ভঙ্গিতে খণ্ডিত অংশে বিভক্ত, যা বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্যকৌশলকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মসজিদের ভেতর ও বাইরে এক সময় টেরাকোটা অলঙ্করণ ছিল, যার কিছু কিছু নিদর্শন এখনো দৃশ্যমান। ছাঁচকৃত কার্নিশ, খিলানবদ্ধ ক্ষুদ্র প্যানেল এবং সামনের দিকে প্রলম্বিত জানালাসদৃশ প্যানেলসমূহ এর অলঙ্করণশৈলীতে বৈচিত্র্য এনেছে।
স্থাপত্য বিশ্লেষণে বিশেষ দিক লক্ষণীয় হচ্ছে, এ মসজিদ একক গম্বুজবিশিষ্ট নামাজ কক্ষের সঙ্গে পূর্বমুখী তিন গম্বুজবিশিষ্ট বারান্দার সমন্বয়। এ বিন্যাস বাংলার প্রচলিত একগম্বুজ বর্গাকৃতি মসজিদগুলোর তুলনায় অধিক গাম্ভীর্যময় ও শৈল্পিক উৎকর্ষতার পরিচায়ক।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলোÑ এ মসজিদের নকশা ও নির্মাণশৈলীর সঙ্গে তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলের কিছু মসজিদের মিল রয়েছে, যা সেলজুক ও ওসমানীয় সালতানাতের আমলের। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তৎকালীন সেলজুক কারিগর বা তাদের প্রভাবিত শিল্পরীতি বাংলার স্থাপত্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং খনিয়াদিঘি মসজিদ তার একটি নিদর্শন। পর্যটকরা এখানে এসে নামাজ আদায়সহ আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখেন।
৫০০ বছরের গৌরবময় ইতিহাসের ধারক এ খনিয়াদিঘি মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি চিরকালই এক অপূর্ব দর্শনীয় স্থান হিসেবে সমাদৃত থাকবে।